ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে বদলে যায় জীবনের গল্প

  • মাহমুদুল করিম খান
  • প্রকাশ : ০২:৩৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
  • ১০৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বিদেশ গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন বহু নারী কর্মী। তাদের অনেকে মারধর, ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। আবার কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে। এসব কারনে গত তিন বছরে প্রবাসে যাওয়া নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে- এই ছন্দপতন ঠেকাতে নারীকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নানা খাতে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে গৃহকর্মীর কাজে বিদেশে গিয়ে তাদের নির্যাতিত নিপীড়িত হতে হবে না।
বিদেশে নারী কর্মসংস্থানের মূল গন্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এসব দেশে অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। সেখানে গিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্নে বদলে গেছে জীবনের গল্প। বিশেষ করে গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরব গিয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেক নারী। সেখানে তাদের দেয়া হত না খাবার, চলতো মারধর। নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন কেউ কেউ। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগও আছে। এতে নারীদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার উৎসাহ কমছে। ফলে গত তিন বছর ধরে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়া কমছে।
ভুক্তভোগী নারীরা বলছেন, বিদেশে প্রতিবাদ করলেই বলা হত, ‘টাকা দিয়ে কিনেছি তোদের’। কোনোমতে ফিরেতে হয়েছে দেশে, তবে দেশে ফিরেও খুব একটা সহায় হয়নি ভাগ্য, প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে সমাজের বাঁকা চাহুনি। কোনো মূল্য দেয় না কেউ।
বিদেশে নারী কর্মীদের এমন হয়রানি ও অত্যাচার নিয়ে নানা সমালোচনার মাঝে কমছে বিদেশগামী নারীদের সংখ্যা। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য, করোনার পর ২০২২ সালে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ নারী কর্মী প্রবাসে যান। ওই বছরে বিদেশে নারী কর্মী গেছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ১০৮ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৬১ হাজার ১৫৮ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে কমেছে ২৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কমেছে ২০ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫৬.৬ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়লেও আনুপাতিক হারে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে আসছে। তিন বছর ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার বইছে। এই সময়ে বিদেশে মোট ৩৪ লাখের বেশি কর্মী গেছেন। এর মধ্যে নারী কর্মী আড়াই লাখের কম।
বিএমইটির তথ্য বলছে, গত বছর মোট ৫৬টি দেশে গেছেন নারী কর্মীরা। ১০ জনের কম গেছেন ৩০টি দেশে। ১৬টি দেশে গেছেন মাত্র ১ জন করে। ১ হাজারের বেশি করে গেছেন ৫টি দেশে। এসব দেশ হলো সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে গত বছর মোট নারী কর্মীর ৬৬ শতাংশ গেছেন। সংখ্যার হিসাবে যা ৪০ হাজারের বেশি।
নারী কর্মীর সংখ্যা কমার পেছনে দক্ষতার ঘাটতি ও নারী নির্যাতনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে অভিবাসী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরু। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মেরিনা সুলতানা বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নারী দেশে ফিরে আসছেন। এ পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি নারী গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাচ্ছেন। তবে সেখানেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই অভিবাসন বিশ্লেষকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যেখানে নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি কম এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, এমন দেশে নারীদের বহুমুখী খাতে পাঠানো উচিত।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যায়। সেখানে অনেকেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারীদের গার্মেন্টসসহ এমন খাতে পাঠানো উচিত, যেখানে তারা অনেকের সঙ্গে মিশে কাজ করতে পারবে এবং নিরাপদ বোধ করবে।’
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। তবে এই সময়ে কতজন নারী, কী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো দফতরে।

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে বদলে যায় জীবনের গল্প

প্রকাশ : ০২:৩৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বিদেশ গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন বহু নারী কর্মী। তাদের অনেকে মারধর, ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। আবার কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে। এসব কারনে গত তিন বছরে প্রবাসে যাওয়া নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে- এই ছন্দপতন ঠেকাতে নারীকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নানা খাতে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে গৃহকর্মীর কাজে বিদেশে গিয়ে তাদের নির্যাতিত নিপীড়িত হতে হবে না।
বিদেশে নারী কর্মসংস্থানের মূল গন্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এসব দেশে অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। সেখানে গিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্নে বদলে গেছে জীবনের গল্প। বিশেষ করে গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরব গিয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেক নারী। সেখানে তাদের দেয়া হত না খাবার, চলতো মারধর। নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন কেউ কেউ। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগও আছে। এতে নারীদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার উৎসাহ কমছে। ফলে গত তিন বছর ধরে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়া কমছে।
ভুক্তভোগী নারীরা বলছেন, বিদেশে প্রতিবাদ করলেই বলা হত, ‘টাকা দিয়ে কিনেছি তোদের’। কোনোমতে ফিরেতে হয়েছে দেশে, তবে দেশে ফিরেও খুব একটা সহায় হয়নি ভাগ্য, প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে সমাজের বাঁকা চাহুনি। কোনো মূল্য দেয় না কেউ।
বিদেশে নারী কর্মীদের এমন হয়রানি ও অত্যাচার নিয়ে নানা সমালোচনার মাঝে কমছে বিদেশগামী নারীদের সংখ্যা। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য, করোনার পর ২০২২ সালে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ নারী কর্মী প্রবাসে যান। ওই বছরে বিদেশে নারী কর্মী গেছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ১০৮ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৬১ হাজার ১৫৮ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে কমেছে ২৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কমেছে ২০ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫৬.৬ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়লেও আনুপাতিক হারে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে আসছে। তিন বছর ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার বইছে। এই সময়ে বিদেশে মোট ৩৪ লাখের বেশি কর্মী গেছেন। এর মধ্যে নারী কর্মী আড়াই লাখের কম।
বিএমইটির তথ্য বলছে, গত বছর মোট ৫৬টি দেশে গেছেন নারী কর্মীরা। ১০ জনের কম গেছেন ৩০টি দেশে। ১৬টি দেশে গেছেন মাত্র ১ জন করে। ১ হাজারের বেশি করে গেছেন ৫টি দেশে। এসব দেশ হলো সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে গত বছর মোট নারী কর্মীর ৬৬ শতাংশ গেছেন। সংখ্যার হিসাবে যা ৪০ হাজারের বেশি।
নারী কর্মীর সংখ্যা কমার পেছনে দক্ষতার ঘাটতি ও নারী নির্যাতনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে অভিবাসী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরু। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মেরিনা সুলতানা বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নারী দেশে ফিরে আসছেন। এ পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি নারী গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাচ্ছেন। তবে সেখানেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই অভিবাসন বিশ্লেষকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যেখানে নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি কম এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, এমন দেশে নারীদের বহুমুখী খাতে পাঠানো উচিত।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যায়। সেখানে অনেকেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারীদের গার্মেন্টসসহ এমন খাতে পাঠানো উচিত, যেখানে তারা অনেকের সঙ্গে মিশে কাজ করতে পারবে এবং নিরাপদ বোধ করবে।’
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। তবে এই সময়ে কতজন নারী, কী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো দফতরে।