ঢাকা ১০:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবারও বিজয়ের বাজিমাত, তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন করছে টিভিকে

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে গেছে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)। কংগ্রেস, বিদুথালাই চিরুথাইগল কাচ্চি (ভিসিকে), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) ও সিপিএমের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে দলটি। শুক্রবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ঘোষণা করে এসব দল। এর মধ্য দিয়ে কয়েকদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান হলো।

গত সোমবার ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলে এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পায় টিভিকে। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় দলটি জেতে ১০৮টি আসন। তবে থালাপতি বিজয় নিজে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কার্যত দলের বিধায়কের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৭। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত ১১৮ সদস্যের সমর্থন।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকে নিজেদের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জোট গঠনের আলোচনা শুরু করে। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আধিপত্য ধরে রাখা এই দুই দল সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাই করতে তৎপর হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সমীকরণ ভেস্তে যায়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই কংগ্রেস টিভিকেকে নিঃশর্ত সমর্থনের ঘোষণা দেয়। শুক্রবার সেই সমর্থনের পরিধি আরও বাড়ে। সিপিআই, সিপিএম ও ভিসিকে—প্রতিটি দল দুটি করে আসন নিয়ে বিজয়ের পাশে দাঁড়ায়। ফলে টিভিকের পক্ষে ১১৮ জনের সমর্থন নিশ্চিত হয়। পরে আরও কয়েকজন স্বতন্ত্র ও ছোট দলের সদস্যের সমর্থন যোগ হওয়ায় এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২১-এ।

প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই চেন্নাইয়ে থালাপতি বিজয়ের বাসভবনের সামনে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। ‘টিভিকে, টিভিকে’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, খুব শিগগিরই বিজয় রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন।

এর আগে সরকার গঠনের আবেদন নিয়ে তিনবার রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিজয়। তবে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আর্লেকর স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার লিখিত সমর্থন ছাড়া কাউকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হবে না। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, এ ক্ষেত্রে বিজেপির পক্ষ থেকে রাজ্যপালের ওপর চাপ ছিল।

বিজয়কে ঠেকাতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে নিজেদের পুরোনো বিরোধ দূরে সরিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালালেও তা কার্যকর হয়নি। ডিএমকে জিতেছে ৫৯টি এবং এআইএডিএমকে ৪৭টি আসন। দুই দলের আসন মিলিয়েও সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১০৬, যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে তাদেরও ছোট দলগুলোর সমর্থনের প্রয়োজন হতো।

এই অবস্থায় নিজের বিধায়কদের একত্রে ধরে রাখার কৌশল নেন বিজয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দল ভাঙনের আশঙ্কা এড়াতে তিনি সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখেন এবং সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

বিজয়ের সরকার গঠনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধী। কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকের জোটসঙ্গী হলেও এবার ফল ঘোষণার পর দ্রুত অবস্থান বদলে টিভিকের পাশে দাঁড়ায়। নির্বাচনে কংগ্রেস পাঁচটি আসন জিতলেও ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। সরকারে অংশীদার হওয়ার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।

কংগ্রেস টিভিকেকে সমর্থন দিলেও একটি রাজনৈতিক শর্ত দিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, বিজয় ও তাঁর দল কোনোভাবেই ‘সম্প্রদায়িক শক্তি’র সঙ্গে জোটে যাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাটি মূলত বিজেপিকে উদ্দেশ্য করেই দেওয়া হয়েছে।

কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে ডিএমকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। ডিএমকে নেতারা অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেস তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শুক্রবারই ডিএমকের শীর্ষ নেতা ও সাংসদ কানিমজি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের জোট কার্যত ভেঙে গেছে। একই সঙ্গে লোকসভায় ডিএমকে সদস্যদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু কংগ্রেস নয়, ডিএমকের দীর্ঘদিনের শরিক সিপিআই ও সিপিএমও এবার বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে। দুই দলই সরকার গঠনে টিভিকের উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় দল ভিসিকেও সমর্থন দিয়েছে বিজয়কে।

এ ছাড়া ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের একজন এবং আম্মা মক্কল মুনেত্রা কাজাগামের একজন বিধায়কের সমর্থনও পাচ্ছেন বিজয়। সব মিলিয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও বেশি সমর্থন এখন তাঁর ঝুলিতে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারে শরিক দলগুলোর জন্য মন্ত্রিসভায় জায়গা রাখা হচ্ছে। সিপিআই, সিপিএম ও ভিসিকে একটি করে মন্ত্রিত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেস চাইছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এই ফলাফলকে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের দুই প্রধান শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে গিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে টিভিকের উত্থান রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন থালাপতি বিজয়।

জনপ্রিয়

আবারও বিজয়ের বাজিমাত, তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন করছে টিভিকে

প্রকাশ : ০২:৪০:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে গেছে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)। কংগ্রেস, বিদুথালাই চিরুথাইগল কাচ্চি (ভিসিকে), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) ও সিপিএমের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে দলটি। শুক্রবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ঘোষণা করে এসব দল। এর মধ্য দিয়ে কয়েকদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান হলো।

গত সোমবার ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলে এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পায় টিভিকে। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় দলটি জেতে ১০৮টি আসন। তবে থালাপতি বিজয় নিজে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কার্যত দলের বিধায়কের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৭। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত ১১৮ সদস্যের সমর্থন।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকে নিজেদের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জোট গঠনের আলোচনা শুরু করে। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আধিপত্য ধরে রাখা এই দুই দল সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাই করতে তৎপর হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সমীকরণ ভেস্তে যায়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই কংগ্রেস টিভিকেকে নিঃশর্ত সমর্থনের ঘোষণা দেয়। শুক্রবার সেই সমর্থনের পরিধি আরও বাড়ে। সিপিআই, সিপিএম ও ভিসিকে—প্রতিটি দল দুটি করে আসন নিয়ে বিজয়ের পাশে দাঁড়ায়। ফলে টিভিকের পক্ষে ১১৮ জনের সমর্থন নিশ্চিত হয়। পরে আরও কয়েকজন স্বতন্ত্র ও ছোট দলের সদস্যের সমর্থন যোগ হওয়ায় এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২১-এ।

প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই চেন্নাইয়ে থালাপতি বিজয়ের বাসভবনের সামনে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। ‘টিভিকে, টিভিকে’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, খুব শিগগিরই বিজয় রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন।

এর আগে সরকার গঠনের আবেদন নিয়ে তিনবার রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিজয়। তবে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আর্লেকর স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার লিখিত সমর্থন ছাড়া কাউকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হবে না। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, এ ক্ষেত্রে বিজেপির পক্ষ থেকে রাজ্যপালের ওপর চাপ ছিল।

বিজয়কে ঠেকাতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে নিজেদের পুরোনো বিরোধ দূরে সরিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালালেও তা কার্যকর হয়নি। ডিএমকে জিতেছে ৫৯টি এবং এআইএডিএমকে ৪৭টি আসন। দুই দলের আসন মিলিয়েও সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১০৬, যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে তাদেরও ছোট দলগুলোর সমর্থনের প্রয়োজন হতো।

এই অবস্থায় নিজের বিধায়কদের একত্রে ধরে রাখার কৌশল নেন বিজয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দল ভাঙনের আশঙ্কা এড়াতে তিনি সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখেন এবং সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

বিজয়ের সরকার গঠনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধী। কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকের জোটসঙ্গী হলেও এবার ফল ঘোষণার পর দ্রুত অবস্থান বদলে টিভিকের পাশে দাঁড়ায়। নির্বাচনে কংগ্রেস পাঁচটি আসন জিতলেও ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। সরকারে অংশীদার হওয়ার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।

কংগ্রেস টিভিকেকে সমর্থন দিলেও একটি রাজনৈতিক শর্ত দিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, বিজয় ও তাঁর দল কোনোভাবেই ‘সম্প্রদায়িক শক্তি’র সঙ্গে জোটে যাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাটি মূলত বিজেপিকে উদ্দেশ্য করেই দেওয়া হয়েছে।

কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে ডিএমকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। ডিএমকে নেতারা অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেস তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শুক্রবারই ডিএমকের শীর্ষ নেতা ও সাংসদ কানিমজি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের জোট কার্যত ভেঙে গেছে। একই সঙ্গে লোকসভায় ডিএমকে সদস্যদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু কংগ্রেস নয়, ডিএমকের দীর্ঘদিনের শরিক সিপিআই ও সিপিএমও এবার বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে। দুই দলই সরকার গঠনে টিভিকের উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় দল ভিসিকেও সমর্থন দিয়েছে বিজয়কে।

এ ছাড়া ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের একজন এবং আম্মা মক্কল মুনেত্রা কাজাগামের একজন বিধায়কের সমর্থনও পাচ্ছেন বিজয়। সব মিলিয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও বেশি সমর্থন এখন তাঁর ঝুলিতে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারে শরিক দলগুলোর জন্য মন্ত্রিসভায় জায়গা রাখা হচ্ছে। সিপিআই, সিপিএম ও ভিসিকে একটি করে মন্ত্রিত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেস চাইছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এই ফলাফলকে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের দুই প্রধান শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে গিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে টিভিকের উত্থান রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন থালাপতি বিজয়।