রাজধানী ঢাকায় আবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬। স্বল্পমাত্রার এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশালে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির।
এর আগে বুধবার দিনগত রাত ৩টা ২৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে বঙ্গোপসাগর ও ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে সিলেটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর তিনটি ভূমিকম্পে কেঁপেছে দেশ। আর এ নিয়ে গত সাত দিনে দেশে ছয়বার ভূমিকম্প হয়েছে।
স্বল্প সময়ে এমন ঘন ঘন কম্পন দেশের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও কম্পনগুলোর মাত্রা ছিল মৃদু-মাঝারি ছিল। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে গত শুক্র ও শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে চারবার ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পটির মাত্র ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭। উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। যা ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। এই ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত হয়। আহত হয় ছয়শ’র বেশি মানুষ।
নরসিংদীতে ভূমিকম্পের সপ্তাহ না পেরোতেই মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে বঙ্গোপসাগর ও সিলেটে ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।
ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) জানিয়েছে, বুধবার গভীর রাতে বঙ্গোপসাগর এলাকায় আঘাত হানা ভূমিকম্পের মাত্রা ছিলো ৪.০। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিলো মাত্র ১০ কিলোমিটার। আর কেন্দ্র থেকে টেকনাফের দূরত্ব ছিল ১২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
বিশেষজ্ঞরা বার বারই বলে আসছেন, ডাউকি চ্যুতি ভারতের মেঘালয় অঙ্গরাজ্যে (বাংলাদেশের উত্তরে) শিলং মালভূমির দক্ষিণ সীমানা বরাবর একটি প্রধান ভূ-চ্যুতি যা উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশসহ সংলগ্ন অঞ্চলের জন্য বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ঝুঁকির উৎস হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন- এসব ‘আফটার শক’ বড় ভূমিকম্পের লক্ষণ হতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর ভূমিকম্পগুলো সাবডাকশন জোন ও এর আশপাশেই হয়ে থাকে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে সিলেটে এবং কক্সবাজারের টেকনাফে দুই দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়। অর্থা গত শুক্রবার পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হলো।
তিনি বলেন, ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছিল, এটা স্মরণকালের মধ্যে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। ভূপৃষ্ঠে এত তীব্রতা এর আগে আমরা কখনো অনুভব করিনি। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার নগরবাসী সাংঘাতিক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আর এ ধরনের ছোট ছোট ভূমিকম্প আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এটি মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করে। শুক্রবারের ভূমিকম্পে ইতোমধ্যে অনেকেই ট্রমাটাইজড হয়ে আছেন।
ঘটনাক্রমে আজও (বৃহস্পতিবার) ভূমিকম্পের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে খুবই কাছে নরসিংদীর পলাশে। ছয়টির মধ্যে তিনটি ভূমিকম্পরেই উৎপত্তিস্থল হলো নরসিংদী। এই এলাকা হলো বার্মা প্লেট এবং পশ্চিমেরটি ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল বা সাবডাকশন জোন। এর এলাকা বিশাল। সিলেটে ও টেকনাফে যে ভূমিকম্প হয়েছে তাও এই সাবডাকশন জোনের র্অর্ন্তভূক্ত।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও ভূতাত্ত্বিক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর মধ্যে পূর্ব পাশে বার্মিজ সাবপ্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেটের একটি অংশ তলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর দিকে ইউরেশিয়ান প্লেটে তলিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট। আবার বার্মিজ সাবপ্লেটও ইউরেশিয়ান প্লেটেরই অংশ। ইউরেশিয়ান প্লেটের উত্তরাংশে একদিকে ইন্ডিয়ান প্লেট তলিয়ে যাচ্ছে। আবার ইউরেশিয়ান প্লেটের পূর্বাংশে যেটিকে বার্মিজ সাবপ্লেট বলা হয় সেটিও নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই তলিয়ে যাওয়াকে সাবডাকশন বলে। যে প্লেটটি আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে সেটি সাবডাক্টিং প্লেট। আর যে প্লেটটি ওপরে চড়ে বসে সেটি অবডাকটিং প্লেট।
তিনি বলেন, তলিয়ে যাওয়া এ সাবডাকশন জোন সিলেট থেকে শুরু হয়ে টেকনাফ পার হয়ে জাভা সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই জোনটি ঢাকার কাছাকাছি। চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকা এই জোনের কাছাকাছি। সাবডাকশন জোনে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম ভূমিকম্পগুলো সংঘটিত হয়। সেক্ষেত্রে ঢাকাসহ কয়েকটি শহর সাবডাকশন জোনের কাছাকাছি অবস্থিত। এজন্য বড় ভূমিকম্প হওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। উত্তর পাশে আছে ডাউকি ফল্ট। যেটি নেত্রকোনা হয়ে সিলেটে ডাউকি হয়ে ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে লম্বা একটি জোন। ভূমিকম্প হওয়ার মতো দুটি জোন আমাদের একেবারেই কাছে। ঐতিহাসিকভাবেও এটি প্রমাণিত যে এখানে বড় ভূমিকম্প হয়েছে।
Reporter Name 









