আড়াই বছর পর দেশে ফেরেন ওমান প্রবাসী মো. বাহার উদ্দিন। তাকে আনতে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। বাড়ি ফেরার পথে সবাই খুব আনন্দে ছিল। গাড়ির মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন সবাই। কিন্তু চালকের ঘুমে সেই আনন্দ বাড়ির দরজায় পৌঁছানোর আগেই শোকে পরিণত হয়।
বুধবার ভোরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নের পূর্ব জগদীশপুরে পৌঁছানোর পর তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালে পড়ে যায়। এ ঘটনায় পরিবারটির সাত সদস্য পানিতে ডুবে মারা যায়।
দুর্ঘটনাস্থলে স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পরপরই গাড়ির চালক খালের পানি থেকে উঠে পালিয়ে যায়। বাহার উদ্দিনসহ পাঁচজন গ্লাস ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারলেও বাকি সাতজন গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন। তারা প্রায় দুই ঘণ্টা পানির নিচে ছিলেন। পরে পুলিশের রেকার দিয়ে গাড়িটি ওঠানোর পর মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেনÑ বাহারের স্ত্রী কবিতা আক্তার (২৪), মেয়ে মীম আক্তার (২), মা মুরশিদা বেগম (৫০), নানী ফয়জুন নেছা (৭০), বড় ভাইয়ের স্ত্রী লাবনী আক্তার (২৫), ভাতিজি রেশমি আক্তার (৯) ও লামিয়া আক্তার (৮)।
চোখের সামনে নিজের মা, স্ত্রী, মেয়ে, নানী, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজিকে হারিয়ে বাহার উদ্দিন শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। তার আহাজারি ও স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ।
দুই বছর বয়সি কন্যাশিশু মিম আক্তারের নিথর দেহ বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন বাহার। কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘তোর জন্য এসেছিলাম মা, তুই কেন লাশ হয়ে এলি।,
বাহার বলেন, ‘আমি ফিরে আসছিলাম সবাইরে বুকে জড়িয়ে ধরতে, অথচ চোখের সামনে সবাইরে হারাই ফেললাম। কারে ছেড়ে কারে বাঁচাব বুঝতে পারি নাই, আমি এখন কারে নিয়ে বাঁচব।’
তিনি বলেন, ‘গাড়িতে আমার মা, স্ত্রী, মেয়ে সবাই আছিল। গাড়ির মধ্যে নানা কিছু নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম সবাই। একসময় মা বলল, তোর জন্য কত অপেক্ষা করেছি, বাপ। কথাটা শেষ হয় নাই, বিকট শব্দের সঙ্গে একটা ধাক্কা খেলাম। এরপর সব ওলটপালট হয়ে গেল।’
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাহার বলেন, ‘খালে পড়ে গাড়িটা নৌকার মতো ভাসতেছিল, ড্রাইভাররে বললাম দরজার লক খুলে দিতে। সে লক খুলে দিলে সবাই সাঁতার কেটে বের হতে পারতাম। কিন্তু চালক লক না খুলে নিজে একটা জানালা দিয়া বের হইয়া গেছে। আমরা কয়েকজন পরে জানালা ভেঙে বের হইছি। আমার মা-মেয়েসহ বাকিরা গাড়িতেই শেষ।’
গাড়ির চালক ঘুম নিয়ে মাইক্রোবাসটি চালাচ্ছিলেন জানিয়ে বাহার বলেন, ‘কুমিল্লায়ও একবার গাড়িটা দুর্ঘটনায় পড়তে গিয়ে রক্ষা পাইছে। আমরা ড্রাইভাররে বললাম প্রয়োজনে একটু ঘুমিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি ঘুম নিয়েই গাড়ি চালাতে গিয়া আবারও দুর্ঘটনায় পড়লেন।’
বাহারের দুই ভাতিজি রেশমি ও লামিয়া ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের জন্য নতুন বই ও স্কুলব্যাগ কেনা হয়েছিল কিছুদিন আগেই। সেই ব্যাগ আর বইয়ের দিকে নিথর হয়ে তাকিয়ে আছেন তাদের মা-বাবা।
বাহারের শ্বশুর ইস্কান্দার মির্জা করে বলেন, ‘চালকের ঘুমের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। চালকের ফাঁসি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের চৌপালী এলাকার বাহারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে শত মানুষের ভিড়। উঠানেও মানুষের জটলা। ঘরে রাখা সাতটি লাশ ঘিরে আহাজারি করছেন স্বজনরা। তবে বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধ আবদুর রহিমের কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেবল চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। স্ত্রী, শাশুড়ি, তিন নাতনি ও দুই পুত্রবধূকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। অনেকেই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কোনো জবাব নেই তার। একপর্যায়ে বিছানা থেকে কোলে করে তাকে উঠানে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে দেন কয়েকজন স্বজন।
এলাকাবাসী জানায়, তিন বছর পর ওমান থেকে দেশে ফিরেছেন আবদুল বাহার। তাই তাকে আনতে মা-নানি, স্ত্রী, মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বাহারকে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। এরপর গতকাল ভোর ৫টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় উত্তর জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, একই পরিবারের সাত নারী-শিশুর মৃত্যুতে পুরো গ্রামে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় সবাই মর্মাহত।
নোয়াখালী ফায়ার সার্ভিসের চৌমুহনী স্টেশনের কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১১ জন ছিলেন। এর মধ্যে দুর্ঘটনার পর চালকসহ ৪ জন বের হয়ে যান। অন্য ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা মাইক্রোবাসের পেছনের সিটগুলোতে ছিলেন। মাইক্রোবাসের চালকের ঘুম ঘুম ভাব থাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।
চন্দ্রগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মো. মোবারক হোসেন বলেন, এটা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটা পুরো একটি পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। চালক ঘুমিয়ে পড়ার অসতর্কতায় এভাবে একটি পরিবার শেষ হয়ে যাবেÑ এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় চালক পলাতক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চালকের নাম পরিচয় জানা যায়নি।
ব্রেকিং নিউজ
চালকের ঘুমে চিরঘুমে একই পরিবারের সাতজন
-
দেশ প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর - প্রকাশ : ০২:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫
- ১০৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা
জনপ্রিয়










