ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারাদেশ। বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাদ যায়নি গণমাধ্যমের অফিসও। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেয় ছাত্র-জনতা। এরপর তা অবরোধ, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে রুপ নেয়। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কর্মসূচি। বিক্ষোভকারীরা হাদির হত্যার দায়ীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
হাদির মৃত্যুর ঘোষণা আসার পর রাজধানীর কারওয়ানবাজারে অবস্থিত দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমের অফিস ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। হামলাকারীরা দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে ভাঙচুর করে আগুন দেয়, এতে দুটি অফিসেই অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। হামলাকারীদের দেওয়া আগুনে ডেইলি স্টার অফিসের নিচ তলা ও দোতলা পুড়ে গেছে। এ সময় সেখানে অবস্থানরত সংবাদকর্মীরা আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাদের ক্রেনের সাহায্যে উদ্ধার করেন এবং আগুন নেভান। অফিসের ভেতরে ভাঙচুর করে ফেলে রাখা জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পরে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। শুক্রবার সকালে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সামনে র্যাব ও পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ জানান, বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় তাদের অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থার ক্ষতিসহ অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত অনলাইন পোর্টালে খবর প্রকাশের কাজ স্থগিত আছে। তবে তারা পরিস্থিতি সামলে দ্রুততম সময়ে কাজ শুরুর চেষ্টা করেছেন।
ডেইলি স্টারের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলাকারীরা ভবনের প্রায় প্রতিটি তলায় হামলা ও ভাঙচুর চালায় এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করেছে।
ডেইলি স্টারে কর্মরত একজন জানিয়েছেন, হামলাকারীরা তার ক্যামেরা, ভিভাইস, হার্ডড্রাইভ সব লুট করে নিয়ে গেছে। কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে তিনি জানান, তার সারা জীবনের সব কাজ এবং স্মৃতি ওগুলোয় সংরক্ষিত ছিল।
এদিন রাত একটার দিকে ধানমন্ডিতে অবস্থিত দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় এবং আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের বের করে দেন।
হামলার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে ছায়ানটের ফেসবুকে দেওয়া এক ঘোষণায়, ভবনটিতে পরিচালিত ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের’ ক্লাসসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আগে দুইবার গুড়িয়ে দেওয়া রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে আবারও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে একদল লোক এই হামলা চালায়। এক্সক্যাভেটর দিয়েও দেয়াল ভাঙতে দেখা যায়। শুক্রবার সকালেও সেখানে কয়েকজন ভাঙচুর করে।
ধানমন্ডি থানার ডিউটি অফিসার এসআই মিঠুন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ছাত্র-জনতা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির দিকে গেছে। আমাদের ওসি, এসি, এডিসি ছাড়াও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত আছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্র-জনতা। বিভিন্ন স্থান থেকে জুলাই মঞ্চের কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হতে থাকে শাহবাগে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে টিএসসি ও হলপাড়া থেকে শোক মিছিল বের করে রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। এই কর্মসূচিতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। পাশাপাশি ঢাকা আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও মিছিলে যোগ দেন।
এই কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের। হাদির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, হাদি একাধিকবার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতৃত্বে টিএসসি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত একটি শোক মিছিল হয়। এতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তাহমীদ আল মুদাসসির চৌধুরীসহ সংগঠনের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, অতীতে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করেছেনু তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
রাত পৌনে ১২টার দিকে শাহবাগে মিছিলে যুক্ত হন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। উপস্থিত হয়েই নাহিদ স্লোগান ধরেন। তিনি বলেন, ‘জান দিয়েছে আমার ভাই, খুনি তোমার রক্ষা নাই, ভারতীয় আগ্রাসন রুখে দাও জনগণ, দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত, আপস না সংগ্রাম, ক্ষমতা না জনতা, তুমি কে আমি কে হাদি হাদি, এক হাদি রক্ত দেবেু লক্ষ হাদি জন্ম নেবে, গোলামি না আজাদি, দিল্লি না ঢাকা, লীগ ধর জেলে ভর’ স্লোগান দেন।
বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে এই বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, বাম জোটের নেতাকর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ সময় ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরাও মিছিলে যোগ দেন। এছাড়া উত্তরায় শহীদ মুগ্ধ মঞ্চে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেনে জুলাইযোদ্ধারা।
কেবল রাজধানীতেই না, হামলার শিকার হয়েছে চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ও। কার্যালয়ের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর কিছু লোক এসে ভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় খুলশী এলাকায় হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন একদল তরুণ। এ সময় তারা হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী স্লোগান দেন। পরে পুলিশের সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের বাড়িতে মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
ঝালকাঠিতে মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন এনসিপি ও নাগরিক অধিকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিকদল ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। হাদির মৃত্যুর খবরে পুরো জেলায় এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকায় তার গ্রামের বাড়িতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ঢল নামছে। এছাড়া পিরোজপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
হাদির মৃত্যুতে দায়ীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গাজীপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে ছাত্র-জনতা। শিববাড়ি ও টঙ্গীর কলেজ গেইটসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে ডুয়েট শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
কুষ্টিয়ার প্রথম আলোর অফিসসহ আওয়ামী নেতাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। রাজশাহীতে বুলডোজার চালিয়ে আওয়ামী লীগের অফিস ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। বগুড়া-শেরপুর মহাসড়কেও বিক্ষোভ করেন ছাত্র-জনতা। এতে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে, দুই প্রান্তে সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজটের। নাটোরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে মধ্যরাতে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এর আগে কিশোরগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে সড়কে অবস্থান নেয় জুলাই যোদ্ধারা।
ব্রেকিং নিউজ
বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ওসমান হাদির মৃত্যু: বিক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ
-
দেশ ডেস্ক - প্রকাশ : ০২:৪০:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- ৫৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জনপ্রিয়










