কুমিল্লার একটি রেলক্রসিংয়ে বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত এবং আরও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। রোববার রাত ২টা ৫৫ মিনিটে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিচয় জানা যায়নি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মোমিন জানান, একটি যাত্রীবাহী বাস রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়লে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি সেটিকে ধাক্কা দেয়। ১২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, তিনজন নারী ও দুই শিশু রয়েছে বলেও জানান ওসি আবদুল মোমিন।
পুলিশ জানায়, ‘মামুন স্পেশাল পরিবহন’-এর লক্ষ্মীপুরগামী বাসটি চুয়াডাঙ্গা থেকে ছেড়ে এসেছিল। বাসটি পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়ার পরই দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ট্রেনটি সেটিকে প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
‘বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে দেখি ট্রেন বাসটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে’
দুর্ঘটনায় আহত যাত্রী ওমর ফারুক কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “আমি বাসে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি আর বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে দেখি ট্রেনটি বাসটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসের ভেতর পুরোপুরি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে। কে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে বা কখন এনেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারেননি।
পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাত ৩টার আগেই ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহত ও নিহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাসটি রেললাইনে উঠে পড়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অজয় ভৌমিক জানান, ভোর ৪টার দিকে হতাহতদের হাসপাতালে আনা হয়। “আমরা ১২টি মরদেহ পেয়েছি। আহতদের মধ্যে আটজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশের মাথায় গুরুতর আঘাত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ছিল,” বলেন তিনি।
নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, রেলওয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অরক্ষিত রেলগেটগুলো ধীরে ধীরে ওভারপাস বা আন্ডারপাসে রূপান্তরের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইতোমধ্যে দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, “গেটটি সম্ভবত খোলা ছিল, যার ফলে চালক রেললাইনে উঠে পড়েন এবং দুর্ঘটনাটি ঘটে।”
দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় নেওয়ার প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে জেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে।
তদন্তে দুই কমিটি গঠন : দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, কমিটিগুলোকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
দেশ প্রতিবেদক, কুমিল্লা 









