ঢাকা ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন টার্গেট করে মাঠ গোছাচ্ছে বিএনপি -জামায়াত

সবার দৃষ্টি নতুন দলে

  • মাহমুদুল করিম খান
  • প্রকাশ : ০৩:০১:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • ৬২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বেশ তৎপর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে, শিগগির নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে। আর ছাত্রদের দল গঠনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে।
এদিকে নতুন রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করাসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে দলটি। অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের শক্তি জানানা দিতে, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে কাজ করছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে আসছে নতুন কিছু চমক।

এদিকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ সবার মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। অপরদিকে শিক্ষার্থীদের জাতীয় নাগরিক কমিটির তত্ত্বাবধানে নতুন দল গঠন করাকে সাধুবাদ জানালেও, এ ব্যাপারে জাতীয় নির্বাচনের সময় অর্ন্তর্বতী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে, বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। এমনকি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে, নতুন দল গঠিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রতিদিনই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা। দলটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দলের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ ফিরে পাওয়ারও আশা করছে। জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দুই স্তরের প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রার্থীও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিংহভাগ সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে দলটি। তবে এটা অফিসিয়ালি ঘোষণা নয়। এটা দলের প্রাথমিক বাছাই। নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা হলে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে বিভিন্ন কৌশলে তারা এসব আসনে সভা-সমাবেশের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। অবশ্য নির্বাচনের আগে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য কিংবা জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও নির্বাচনি বোর্ড পরিচালনার সভাপতি অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল সারাদেশে বিভিন্ন নির্বাচনি আসনে গিয়ে দলের রোকনদের মতামত নিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে সেটি এক ধরনের প্রাথমিক তালিকা। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে ওই তালিকা আরও সংশোধন হতে পারে।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন কমিটি। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে একদিনেই ১৩ জেলায় নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। জেলায় জেলায় চলছে সম্মেলন। বেশ কয়েকটি জেলায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিও করা হয়েছে। এসব কমিটিতে সাবেক ছাত্রদল ও যুবদল নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের দিকে নজর দিয়েছেন। আমরাও চাই নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম আসুক। প্রায় জেলাগুলোতেই সাবেক ছাত্রদলের নেতারা নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যান্য জেলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। আগামী দিনের নেতৃত্ব পুরোপুরি সাবেক ছাত্রদলের নেতাদের হাতে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় ভোটের মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন কমিটি হচ্ছে। যারা আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, দলের প্রতি যাদের কমিটমেন্ট রয়েছে, কমিটিতে তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তরুণ নেতৃত্ব। স্থবির ও গুটিয়ে যাওয়া বিএনপির আন্দোলন চাঙ্গা হওয়ার পেছনে তরুণ নেতাদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করতেও অগ্রণী অবস্থান তাদের। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিকে সফল করতে উদ্যোগী রয়েছেন তরুণ নেতারা। তাই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটিতে স্থান পাচ্ছেন বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতারা।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, বিগত সময়ে যেসব নেতা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কমিটিগুলোতে তাদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। আমাদের মূল ফোকাস থাকবে ছাত্রদল থেকে যারা উঠে এসেছে তাদের এগিয়ে নেওয়া। বিএনপির মূল নেতৃত্বে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) পাবেন। এছাড়া প্রায় জেলাগুলোতেই সাবেক ছাত্রদলের নেতারা নেতৃত্বে রয়েছেন। তাছাড়া অন্যান্য জেলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। আমরা চাই আগামী দিনের নেতৃত্ব পুরোপুরি সাবেক ছাত্র নেতৃত্ব নির্ভর হোক।

অন্যদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সেই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। অভ্যুত্থানের শক্তিকে সংহত করে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অভ্যুত্থানের নেতাদের উদ্যোগে গত সেপ্টেম্বরে যাত্রা করে জাতীয় নাগরিক কমিটি। বর্তমানে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য কাজ করছে সংগঠনটি। সেই লক্ষ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে সংগঠনকে সুসংহত করছে তারা। ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১৩০টি থানা ও উপজেলায় প্রতিনিধি কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্য দিয়ে শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম এই শক্তি।

আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। দেশ পুনর্গঠনে তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে কমিটিগুলো করা হচ্ছে। প্রতিনিধি কমিটির সদস্যদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ঢাকার মধ্যে সেটি ৪৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। এসব কমিটিতে শিক্ষক, আইনজীবী, লেখক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা যুক্ত হচ্ছেন।

তবে জাতীয় নাগরিক কমিটি চমক দেখিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। এ কমিটিতে দেশের জনপ্রিয় তরুণ ও ছাত্রনেতারা যুক্ত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক নেতা, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের নেতা, অ্যাকটিভিস্ট, চিন্তক, চিকিৎসা, আইন, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন সেক্টরে বর্তমানে যেসব তরুণ জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তাদের সম্মিলন ঘটছে।

কেন্দ্রীয় কমিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক ডাকসু নেতাদের মধ্যে আছেন সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন, যিনি নাগরিক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন, শামসুন নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্র সংসদের জিএস মুনিরা শারমিন, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল সংসদে জিএস সাগুফ্তা বুশরা মিশমা, নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সারজিস আলমও অমর একুশে হল সংসদের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচন করা অরণি সেমন্তি খান, উম্মে হাবিবা বেনজির, দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সৈয়দা নীলিমা দোলা আলোচিত ছাত্র প্রতিনিধি ছিলেন।

সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে আছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ, রাফে সালমান রিফাত, ঢাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরাম হুসাইন, ঢাবি ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি আবু রায়হান খান।

এ ছাড়া তরুণ জনপ্রিয় আইনজীবীদের মধ্যে নাগরিক কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন অ্যাডভোকেট মানজুর আল মতিন, অ্যাডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান, মনজিলা ঝুমা, হুমায়রা নূর ও সাকিল আহমাদ। সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক নেতা মীর আরশাদুল হক, আরিফুর রহমান তুহিন, প্লাবন তারিখ ও জয়নাল আবেদীন শিশির।

এ ছাড়া কমিটির সদস্যদের মধ্যে আছেন মায়ের ডাকের সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি, চিকিৎসক তাসনীম জারা, চিকিৎসক ও অ্যাকটিভিস্ট তাজনূভা জাবীন, ডা. মাহমুদা মিতু, বাংলাদেশে মেটার পাবলিক পলিসি প্রধান সাবহানাজ রশীদ দিয়া, গবেষক ও লেখক সারোয়ার তুষার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাবেক সদস্য প্রীতম দাশ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, অ্যাকটিভিস্টদের মধ্যে মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান, সালেহ উদ্দিন সিফাত, আরেফীন মোহাম্মদ ও নাহিদা সারোয়ার নিভা অন্যতম।

নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নতুন দল শপথ নেবে। নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক দল। ৫ আগস্টের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের সাথে, জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটকে সামনে রেখে আমরা সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যা হাজারো শহীদের রক্তে গড়া, একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ।

Tag :

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন টার্গেট করে মাঠ গোছাচ্ছে বিএনপি -জামায়াত

সবার দৃষ্টি নতুন দলে

প্রকাশ : ০৩:০১:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বেশ তৎপর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে, শিগগির নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে। আর ছাত্রদের দল গঠনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে।
এদিকে নতুন রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করাসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে দলটি। অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের শক্তি জানানা দিতে, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে কাজ করছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে আসছে নতুন কিছু চমক।

এদিকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ সবার মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। অপরদিকে শিক্ষার্থীদের জাতীয় নাগরিক কমিটির তত্ত্বাবধানে নতুন দল গঠন করাকে সাধুবাদ জানালেও, এ ব্যাপারে জাতীয় নির্বাচনের সময় অর্ন্তর্বতী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে, বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। এমনকি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে, নতুন দল গঠিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রতিদিনই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা। দলটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দলের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ ফিরে পাওয়ারও আশা করছে। জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দুই স্তরের প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রার্থীও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিংহভাগ সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে দলটি। তবে এটা অফিসিয়ালি ঘোষণা নয়। এটা দলের প্রাথমিক বাছাই। নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা হলে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে বিভিন্ন কৌশলে তারা এসব আসনে সভা-সমাবেশের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। অবশ্য নির্বাচনের আগে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য কিংবা জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও নির্বাচনি বোর্ড পরিচালনার সভাপতি অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল সারাদেশে বিভিন্ন নির্বাচনি আসনে গিয়ে দলের রোকনদের মতামত নিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে সেটি এক ধরনের প্রাথমিক তালিকা। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে ওই তালিকা আরও সংশোধন হতে পারে।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন কমিটি। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে একদিনেই ১৩ জেলায় নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। জেলায় জেলায় চলছে সম্মেলন। বেশ কয়েকটি জেলায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিও করা হয়েছে। এসব কমিটিতে সাবেক ছাত্রদল ও যুবদল নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের দিকে নজর দিয়েছেন। আমরাও চাই নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম আসুক। প্রায় জেলাগুলোতেই সাবেক ছাত্রদলের নেতারা নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যান্য জেলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। আগামী দিনের নেতৃত্ব পুরোপুরি সাবেক ছাত্রদলের নেতাদের হাতে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় ভোটের মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন কমিটি হচ্ছে। যারা আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, দলের প্রতি যাদের কমিটমেন্ট রয়েছে, কমিটিতে তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তরুণ নেতৃত্ব। স্থবির ও গুটিয়ে যাওয়া বিএনপির আন্দোলন চাঙ্গা হওয়ার পেছনে তরুণ নেতাদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করতেও অগ্রণী অবস্থান তাদের। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিকে সফল করতে উদ্যোগী রয়েছেন তরুণ নেতারা। তাই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটিতে স্থান পাচ্ছেন বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতারা।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, বিগত সময়ে যেসব নেতা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কমিটিগুলোতে তাদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। আমাদের মূল ফোকাস থাকবে ছাত্রদল থেকে যারা উঠে এসেছে তাদের এগিয়ে নেওয়া। বিএনপির মূল নেতৃত্বে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) পাবেন। এছাড়া প্রায় জেলাগুলোতেই সাবেক ছাত্রদলের নেতারা নেতৃত্বে রয়েছেন। তাছাড়া অন্যান্য জেলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। আমরা চাই আগামী দিনের নেতৃত্ব পুরোপুরি সাবেক ছাত্র নেতৃত্ব নির্ভর হোক।

অন্যদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সেই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। অভ্যুত্থানের শক্তিকে সংহত করে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অভ্যুত্থানের নেতাদের উদ্যোগে গত সেপ্টেম্বরে যাত্রা করে জাতীয় নাগরিক কমিটি। বর্তমানে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য কাজ করছে সংগঠনটি। সেই লক্ষ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে সংগঠনকে সুসংহত করছে তারা। ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১৩০টি থানা ও উপজেলায় প্রতিনিধি কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্য দিয়ে শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম এই শক্তি।

আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। দেশ পুনর্গঠনে তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে কমিটিগুলো করা হচ্ছে। প্রতিনিধি কমিটির সদস্যদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ঢাকার মধ্যে সেটি ৪৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। এসব কমিটিতে শিক্ষক, আইনজীবী, লেখক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা যুক্ত হচ্ছেন।

তবে জাতীয় নাগরিক কমিটি চমক দেখিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। এ কমিটিতে দেশের জনপ্রিয় তরুণ ও ছাত্রনেতারা যুক্ত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক নেতা, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের নেতা, অ্যাকটিভিস্ট, চিন্তক, চিকিৎসা, আইন, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন সেক্টরে বর্তমানে যেসব তরুণ জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তাদের সম্মিলন ঘটছে।

কেন্দ্রীয় কমিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক ডাকসু নেতাদের মধ্যে আছেন সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন, যিনি নাগরিক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন, শামসুন নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্র সংসদের জিএস মুনিরা শারমিন, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল সংসদে জিএস সাগুফ্তা বুশরা মিশমা, নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সারজিস আলমও অমর একুশে হল সংসদের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচন করা অরণি সেমন্তি খান, উম্মে হাবিবা বেনজির, দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সৈয়দা নীলিমা দোলা আলোচিত ছাত্র প্রতিনিধি ছিলেন।

সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে আছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ, রাফে সালমান রিফাত, ঢাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরাম হুসাইন, ঢাবি ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি আবু রায়হান খান।

এ ছাড়া তরুণ জনপ্রিয় আইনজীবীদের মধ্যে নাগরিক কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন অ্যাডভোকেট মানজুর আল মতিন, অ্যাডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান, মনজিলা ঝুমা, হুমায়রা নূর ও সাকিল আহমাদ। সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক নেতা মীর আরশাদুল হক, আরিফুর রহমান তুহিন, প্লাবন তারিখ ও জয়নাল আবেদীন শিশির।

এ ছাড়া কমিটির সদস্যদের মধ্যে আছেন মায়ের ডাকের সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি, চিকিৎসক তাসনীম জারা, চিকিৎসক ও অ্যাকটিভিস্ট তাজনূভা জাবীন, ডা. মাহমুদা মিতু, বাংলাদেশে মেটার পাবলিক পলিসি প্রধান সাবহানাজ রশীদ দিয়া, গবেষক ও লেখক সারোয়ার তুষার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাবেক সদস্য প্রীতম দাশ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, অ্যাকটিভিস্টদের মধ্যে মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান, সালেহ উদ্দিন সিফাত, আরেফীন মোহাম্মদ ও নাহিদা সারোয়ার নিভা অন্যতম।

নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নতুন দল শপথ নেবে। নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক দল। ৫ আগস্টের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের সাথে, জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটকে সামনে রেখে আমরা সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যা হাজারো শহীদের রক্তে গড়া, একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ।