অর্ন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলাপকালে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি।
শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে স্থানীয় সময় মধ্যাহ্নের পর দুই প্রতিবেশী দেশের শীর্ষ নেতারা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন তারা।
অর্ন্তর্র্বতীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথমবারের মতো অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।
শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। আমাদের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে।’
প্রেস সচিব বলেন, আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যতগুলো বিষয় ছিল, সবগুলো বিষয়ই প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। যেমন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কথা হয়েছে। শেখ হাসিনা যে ওখানে (ভারতে) বসে ইনসিন্ডিয়ারে (হিংসাত্মক) কথা বলছেন, সেগুলো নিয়ে কথা হয়েছে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, নতুন করে সেটা করা নিয়ে কথা হচ্ছে। তিস্তা পানি চুক্তি নিয়েও কথা হয়েছে।’
বৈঠক সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. ইউনূসকে যখন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা জানান তখন তিনি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানান। যদি আরও কিছু সংস্কার প্রয়োজন পড়ে সে ক্ষেত্রে বাকি সংস্কার সম্পন্ন করে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে নরেন্দ্র মোদিকে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
বৈঠক শেষে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে ‘গঠনমূলক সম্পর্ক নষ্ট করে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলার’ আহ্বান জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে ঢাকার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছে নয়াদ্দিল্লি।
তিনি আরও বলেন, ‘মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার কথা তুলে ধরে, যা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে এনেছে।’
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি তার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে অনুরোধ এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখন আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।
তবে বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হয়, এ ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। তবে ভারত বিষয়টির নোট নিয়েছে।
মিশ্রি বলেন, এই চেতনায়, তিনি (মোদি) বাস্তববাদী মনোভাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলায় ভারতের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। পরিবেশ দূষণকারী যে কোনো বক্তব্য এড়িয়ে চলাই ভালো। সীমান্ত নিরাপত্তাও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। যেখানে মোদি অবৈধ পারাপার রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি উত্থাপন করেছেন মোদি।
বৈঠকের পর নরেন্দ্র মোদির হাতে একটি আলোকচিত্র তুলে দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারিতে ভারতের মুম্বাইতে ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস হয়েছিল, সেখানেই প্রথমবার ড. ইউনূসকে স্বর্ণপদকে সম্মানিত করেছিল ভারত সরকার। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসের হাতে সেই পদক তুলে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে। পুরস্কার নেওয়ার সেই ছবি নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চপ্রতিনিধি খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম ও পররাষ্ট্রসচিব মো. জসিম উদ্দিন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর টানাপোড়েনের মধ্যে যাচ্ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস বাংলাদেশের আপৎকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য স্বস্তিকর নয় এমন নানা ঘটনা ঘটেছে। ইউনূস সরকারের সমালোচনায় মুখর ভারতীয় মেইন স্ট্রিম মিডিয়া। নেতিবাচক এই প্রচারণাকে বহুবার প্রত্যাখ্যান করেছে ঢাকা। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল অধ্যাপক ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো আলোচনায় বসলেন।
বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের (বিমসটেক) শীর্ষ সম্মেলন ২ থেকে ৪ এপ্রিল ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিমসটেকের পরবর্তী সভাপতির দায়িত্ব ইতিমধ্যে নিয়েছে বাংলাদেশ। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার সকালে ব্যাংকক পৌঁছান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। এদিন বিমসটেক নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির দেখা হয়। নৈশভোজে একই টেবিলে তারা পাশাপাশি বসেছেন, করেছেন কুশল বিনিময়। সম্মেলনের আয়োজক থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা এই নৈশভোজের আয়োজন করেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দুই সরকার প্রধান যোগ দিলেও শিডিউল জটিলতায় তাদের সাক্ষাৎ বা পাশাপাশি বসার সুযোগ হয়নি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কে উত্থান-পতন হয়। বাংলাদেশ-ভারত কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, দুই ভূখণ্ডের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যুগ যুগ ধরে। এই সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতা বিবৃতি আর কূটনীতি এক নয়। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ওই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ইউনূস ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিশ্বের অন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের মতোই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাছাড়া গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষেও মোদি শুভেচ্ছা জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে চিঠি পাঠান।
ব্রেকিং নিউজ
ব্যাংককে ইউনূস-মোদি বৈঠক
হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইল বাংলাদেশ, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ভারতের
-
মাহমুদুল করিম খান - প্রকাশ : ০২:০১:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
- ১৫৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জনপ্রিয়










