বাংলাদেশ সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত ২০.৮৩ একর জমিতে বর্তমানে ৪১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি দুটি বড় ভবন করা হলেও জায়গা সংকট থেকেই যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যে সব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের প্রয়োজনীয় জায়গা বরাদ্দ নিয়ে সমস্যায় পড়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কার্যক্রম ও জনবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই জায়গায় সব মন্ত্রণালয় না থাকায় সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি জায়গা বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩০টি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ কাজ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সচিবালয়ের ভেতরে স্থানান্তর করা অত্যাবশ্যক। তবে জায়গা সংকট নিয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্তাব্যক্তিকোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানা গেছে, প্রশাসনের পরিধি দিন দিনই বাড়ছে। অনুমোদিত পদ বাড়ানোর কারণে বাড়ছে জনবল, বাড়ছে জায়গার সংকট।
জায়গা সংকটের কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন অনুবিভাগ ও দপ্তর সচিবালয়ের বাইরের বিভিন্ন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। চাহিদা বাড়ার কারণে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের আকার আরো বড় করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষে সচিবালয়সংলগ্ন গুলিস্তানের পুরনো জিপিও ভবনের প্রায় পাঁচ একর জায়গা নিতে যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তাতে নির্মাণ করা হবে দৃষ্টিনন্দন ভবন। সচিবালয়ের সঙ্গে ওই সব ভবনে যাতায়াতের জন্য পূর্ব পাশের রাস্তার ওপর দিয়ে সংযোগ সেতু ও নিচ দিয়ে তৈরি করা হবে পাতাল পথ। এরই মধ্যে এসংক্রান্ত প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ সম্মতি দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। সচিবালয়ে অর্থবিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জন্য দুটি সুউচ্চ বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে এই দুটি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে স্থানান্তর করা হয়েছে। অনেক আগেই সচিবালয়ের কয়েকটি ভবনকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু জিপিও’র জায়গায় নতুন সচিবালয় নির্মাণ প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তারা এখনো জমিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করছে না। বিষয়টি নিয়ে গত জুনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে ডিও দিয়েছে পূর্ত মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়, বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও সচিব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য স্থান বরাদ্দ চেয়ে আধা-সরকারি পত্র দিয়েছেন। পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান না হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া গহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এসব মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়টি বিবেচনাপূর্বক জিপিওর স্থানে সচিবালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য বর্ণিত জমি বিনামূল্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে হস্তান্তরের প্রস্তাবে প্রধান উপদেষ্টা সদয় অনুমোদন দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগের আপত্তি থাকলেও এ জায়গায় বেশ কয়েকটি মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে। তারা বলছে, জিপিওর জায়গা পরিত্যক্ত দেখিয়ে সচিবালয় বর্ধিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডাক বিভাগের তথ্যমতে, অন্তত ২৫টি সরকারি অফিসের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একদিনের জন্যও জায়গাটি পরিত্যক্ত ছিল না। প্রতিদিনই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা কাজ এখান থেকে সম্পাদিত হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত ১৭ এপ্রিল সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনের জন্য প্রধান স্থপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. নাজমুল আলম স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়, ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত ডাক বিভাগের জিপিও ভবন এলাকার ৪ দশমিক ৮০১৬ একর জায়গা ইতিমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই জমি সংযুক্ত করে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনপূর্বক দ্রুত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য বলা হয়।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত ২০ দশমিক ৮৩ একর জমিতে বর্তমানে ৪২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম ও জনবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসের স্থান সংকুলান করা যাচ্ছে না। ডাক অধিদপ্তরের অব্যবহৃত স্থানটি সচিবালয় সংলগ্ন হওয়ায় ওই স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ করে সচিবালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে সচিবালয়ের স্থান সংকটের সমাধান হবে এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠকে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের তথ্য, শৃঙ্খলা, দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখেছে। উপসচিব পদে প্রায় ৭০০ কর্মকর্তার তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ৩০তম বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের ২৭৭ জনসহ মোট ৩১৯ জন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য ক্যাডার থেকে ডিএস পুলে আবেদন করা ২২৩ জন কর্মকর্তার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ২৫০-২৮০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের নাম প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে। তারা ২০১৯ সালে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলেও ২০২১ সালে তা বাস্তবায়ন হয়। এবার অতিরিক্ত সচিব পদে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রশাসন ক্যাডারের ২৪৪ জন কর্মকর্তা ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডার মিলে ৩০০ জনের বেশি কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব পদে বিবেচনাধীন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদসংখ্যা ২১২ হলেও দায়িত্বে রয়েছেন ৩৭০ জন। যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ১,০৩৪ জন। সুপারনিউমারারি পদসহ উপসচিব পদে অনুমোদিত সংখ্যা ১,৪২০, যেখানে কর্মরত রয়েছেন ১,৪০২ জন।এর মানে, প্রায় প্রতিটি স্তরেই অনুমোদিত পদের তুলনায় বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। নতুন করে সরকার এসব কর্তমর্তাদের পনোন্নতি দিলে এ সংকট আরও তীব্র হবে।
দেশ প্রতিবেদক 









