ঢাকা ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অমরত্বের স্বপ্নে পুতিন, ‘দীর্ঘায়ু প্রকল্প’ ঘিরে আলোড়ন

  • দেশ ডেস্ক
  • প্রকাশ : ০৭:৩৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
  • ৫৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক আলোচনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের আয়ু অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়ানো বা ‘অমরত্ব’ অর্জনের কথা বলেছিলেন।

শুরুতে বিষয়টি দুই রাষ্ট্রনেতার সাধারণ কৌতুকপূর্ণ আলাপ হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনের পেছনে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ও রাষ্ট্রীয় গবেষণা কর্মসূচির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ধনকুবেরদের মতোই পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য প্রতিরোধ ও মানব আয়ু বৃদ্ধির গবেষণায় গভীর আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। তবে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় যেখানে এসব উদ্যোগ মূলত ব্যক্তিগত বা বেসরকারি খাতে সীমাবদ্ধ, রাশিয়ায় তা ক্রমেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অংশ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাশিয়ায় বর্তমানে থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং, প্রাণীর শরীরে মানব অঙ্গ উৎপাদন, জিনভিত্তিক চিকিৎসা এবং অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও থেরাপির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে রুশ সরকার ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ প্রকল্প ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় এমন একটি জিন থেরাপি উন্নয়নের কাজ চলছে, যা কোষের বার্ধক্যের গতি ধীর করতে সক্ষম হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি ২৩ এপ্রিল এক বক্তব্যে এটিকে বার্ধক্যবিরোধী গবেষণার অন্যতম সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

ল্যাবে মানব অঙ্গ তৈরির লক্ষ্য : এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ল্যাবরেটরিতে মানব অঙ্গ তৈরি করে তা প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি উন্নয়ন। ২০২৪ সালে পুতিন ঘোষিত জাতীয় দীর্ঘায়ু কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প সফল হলে দশকের শেষ নাগাদ প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

রুশ গবেষকেরা বর্তমানে মূলত দুটি প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন—বায়োপ্রিন্টিং, অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যু তৈরি, এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন, যেখানে শূকরের শরীরে মানব অঙ্গ উৎপাদনের গবেষণা চলছে।

গবেষকদের দাবি, ইতোমধ্যে মানব কার্টিলেজ টিস্যু ও ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রাশিয়ায় এ খাতে একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি চলছে, যেখানে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

নেতৃত্বে পুতিন ঘনিষ্ঠ গবেষকেরা : এই দীর্ঘায়ু প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের কন্যা, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি সোভিয়েত যুগের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান।

কোভালচুকের মতে, ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি আসতে পারে যেখানে মানবদেহের বিভিন্ন অংশ অনির্দিষ্টকাল ধরে মেরামত ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে। তবে তিনি বলেন, সরাসরি ‘অমরত্ব’ নিয়ে কথা বলা কঠিন হলেও মানুষের শরীরকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার সক্ষমতা ক্রমেই বাড়বে।

৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে শারীরিকভাবে সক্ষম ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। খালি গায়ে শিকার, আইস হকি খেলা কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর মতো তার বিভিন্ন কার্যক্রম সেই ভাবমূর্তিকে আরও জোরদার করেছে।

তবে রাশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বগদানভ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে তারুণ্য ফেরানোর পরীক্ষায় যুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণ হয়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক ওলেক্সান্দর বোগোমোলেতস মানুষের ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচার সম্ভাবনার কথা বললেও তিনিও তুলনামূলক কম বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন।

বর্তমানে রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু প্রায় ৬৮ বছর, যা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে পরিসংখ্যানে দেখা যায়।

জনপ্রিয়

অমরত্বের স্বপ্নে পুতিন, ‘দীর্ঘায়ু প্রকল্প’ ঘিরে আলোড়ন

প্রকাশ : ০৭:৩৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক আলোচনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের আয়ু অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়ানো বা ‘অমরত্ব’ অর্জনের কথা বলেছিলেন।

শুরুতে বিষয়টি দুই রাষ্ট্রনেতার সাধারণ কৌতুকপূর্ণ আলাপ হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনের পেছনে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ও রাষ্ট্রীয় গবেষণা কর্মসূচির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ধনকুবেরদের মতোই পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য প্রতিরোধ ও মানব আয়ু বৃদ্ধির গবেষণায় গভীর আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। তবে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় যেখানে এসব উদ্যোগ মূলত ব্যক্তিগত বা বেসরকারি খাতে সীমাবদ্ধ, রাশিয়ায় তা ক্রমেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অংশ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাশিয়ায় বর্তমানে থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং, প্রাণীর শরীরে মানব অঙ্গ উৎপাদন, জিনভিত্তিক চিকিৎসা এবং অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও থেরাপির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে রুশ সরকার ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ প্রকল্প ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় এমন একটি জিন থেরাপি উন্নয়নের কাজ চলছে, যা কোষের বার্ধক্যের গতি ধীর করতে সক্ষম হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি ২৩ এপ্রিল এক বক্তব্যে এটিকে বার্ধক্যবিরোধী গবেষণার অন্যতম সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

ল্যাবে মানব অঙ্গ তৈরির লক্ষ্য : এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ল্যাবরেটরিতে মানব অঙ্গ তৈরি করে তা প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি উন্নয়ন। ২০২৪ সালে পুতিন ঘোষিত জাতীয় দীর্ঘায়ু কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প সফল হলে দশকের শেষ নাগাদ প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

রুশ গবেষকেরা বর্তমানে মূলত দুটি প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন—বায়োপ্রিন্টিং, অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যু তৈরি, এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন, যেখানে শূকরের শরীরে মানব অঙ্গ উৎপাদনের গবেষণা চলছে।

গবেষকদের দাবি, ইতোমধ্যে মানব কার্টিলেজ টিস্যু ও ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রাশিয়ায় এ খাতে একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি চলছে, যেখানে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

নেতৃত্বে পুতিন ঘনিষ্ঠ গবেষকেরা : এই দীর্ঘায়ু প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের কন্যা, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি সোভিয়েত যুগের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান।

কোভালচুকের মতে, ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি আসতে পারে যেখানে মানবদেহের বিভিন্ন অংশ অনির্দিষ্টকাল ধরে মেরামত ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে। তবে তিনি বলেন, সরাসরি ‘অমরত্ব’ নিয়ে কথা বলা কঠিন হলেও মানুষের শরীরকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার সক্ষমতা ক্রমেই বাড়বে।

৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে শারীরিকভাবে সক্ষম ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। খালি গায়ে শিকার, আইস হকি খেলা কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর মতো তার বিভিন্ন কার্যক্রম সেই ভাবমূর্তিকে আরও জোরদার করেছে।

তবে রাশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বগদানভ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে তারুণ্য ফেরানোর পরীক্ষায় যুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণ হয়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক ওলেক্সান্দর বোগোমোলেতস মানুষের ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচার সম্ভাবনার কথা বললেও তিনিও তুলনামূলক কম বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন।

বর্তমানে রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু প্রায় ৬৮ বছর, যা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে পরিসংখ্যানে দেখা যায়।