ঢাকা ০৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় সরকার ইস্যুতে সরব শরিকরা

ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকে শরিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও দাবির কথা মনোযোগ সহকারে শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠন, ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব, রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার এবং যুগপৎ আন্দোলনের নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন জোট নেতারা। অন্যদিকে, সরকার প্রধান শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পরামর্শ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দিয়েছেন।


গত সোমবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মতবিনিময় সভা ও নৈশভোজে এসব বিষয় উঠে আসে। বিএনপি সরকার গঠনের পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। রাজনৈতিক মহলে এই বৈঠককে ভবিষ্যৎ জোট রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠন ও অংশীদারিত্বের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এতে শরিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা হতাশা ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, আন্দোলনের সময় যে ঐক্য ও সমন্বয় ছিল, সরকার গঠনের পর তা অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে।
একাধিক নেতা প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বলেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক উপস্থিতি আগের তুলনায় কম দৃশ্যমান। এতে বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলেও তারা মত দেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বীকার করেন, সরকার গঠনের পর কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা ছিল। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র, ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শরিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চান।
তিনি আরও জানান, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বৈঠক নয়; বরং ভবিষ্যতে শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও মতবিনিময়ের সূচনা। সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বৈঠকে বলেন, আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাই সরকার যদি এককভাবে চলার নীতি গ্রহণ করে এবং ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় জোটসঙ্গীরা নেবে না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, অর্থনৈতিক খাতে সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংস্কার, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও ৩১ দফা নিয়ে যেসব সমালোচনা হচ্ছে, তার কার্যকর রাজনৈতিক জবাব দিতে সরকার পিছিয়ে রয়েছে।
১২ দলীয় জোটের নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও শরিকদের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
১২ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল করিম খান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিলো এক সাথে আন্দোলন, এক সাথে সরকার গঠন। যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এ নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির দুরুত্ব তৈরি হয়। এ অবস্থায় শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে জোটকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি অনেকটা নেই বললেই চলে। আর সেই সুযোগে নানা ধরনের সরকার বিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে বিরোধী দল। এজন্য সরকার পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার করা প্রয়োজন।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, আন্দোলনের সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যে সমন্বয় ছিল, সরকার গঠনের পর সেই ধারাবাহিকতা আর দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে শরিকদের প্রত্যাশা এখনো রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথচলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শরিকদের ক্ষোভ, জাতীয় সরকার নিয়ে প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্ন আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

জনপ্রিয়

জাতীয় সরকার ইস্যুতে সরব শরিকরা

প্রকাশ : ০৮:৩২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকে শরিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও দাবির কথা মনোযোগ সহকারে শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠন, ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব, রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার এবং যুগপৎ আন্দোলনের নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন জোট নেতারা। অন্যদিকে, সরকার প্রধান শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পরামর্শ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দিয়েছেন।


গত সোমবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মতবিনিময় সভা ও নৈশভোজে এসব বিষয় উঠে আসে। বিএনপি সরকার গঠনের পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। রাজনৈতিক মহলে এই বৈঠককে ভবিষ্যৎ জোট রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠন ও অংশীদারিত্বের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এতে শরিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা হতাশা ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, আন্দোলনের সময় যে ঐক্য ও সমন্বয় ছিল, সরকার গঠনের পর তা অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে।
একাধিক নেতা প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বলেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক উপস্থিতি আগের তুলনায় কম দৃশ্যমান। এতে বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলেও তারা মত দেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বীকার করেন, সরকার গঠনের পর কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা ছিল। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র, ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শরিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চান।
তিনি আরও জানান, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বৈঠক নয়; বরং ভবিষ্যতে শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও মতবিনিময়ের সূচনা। সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বৈঠকে বলেন, আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাই সরকার যদি এককভাবে চলার নীতি গ্রহণ করে এবং ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় জোটসঙ্গীরা নেবে না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, অর্থনৈতিক খাতে সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংস্কার, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও ৩১ দফা নিয়ে যেসব সমালোচনা হচ্ছে, তার কার্যকর রাজনৈতিক জবাব দিতে সরকার পিছিয়ে রয়েছে।
১২ দলীয় জোটের নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও শরিকদের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
১২ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল করিম খান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিলো এক সাথে আন্দোলন, এক সাথে সরকার গঠন। যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এ নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির দুরুত্ব তৈরি হয়। এ অবস্থায় শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে জোটকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি অনেকটা নেই বললেই চলে। আর সেই সুযোগে নানা ধরনের সরকার বিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে বিরোধী দল। এজন্য সরকার পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার করা প্রয়োজন।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, আন্দোলনের সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যে সমন্বয় ছিল, সরকার গঠনের পর সেই ধারাবাহিকতা আর দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে শরিকদের প্রত্যাশা এখনো রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথচলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শরিকদের ক্ষোভ, জাতীয় সরকার নিয়ে প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্ন আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।