দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলন, বিতর্কিত ভর্তি পরীক্ষা এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনি নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। ঠিক তৃতীয় দফার বৈঠক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তার এই ঘোষণা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন কি না কিংবা নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। দীর্ঘ বার্তায় দায়িত্ব স্বীকার: পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিক্ষা, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
তিনি লেখেন, দেশের তরুণদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ তার কাছে সবসময়ই অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশসেবার সুযোগ পাওয়াকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম ঘিরে সংকট: ২০২৬ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় দুর্বলতা এবং পরীক্ষা মাফিয়ার সক্রিয়তার বিষয়ে।
ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, অভিযোগ ওঠার পরপরই কেন্দ্রীয় সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইকে দেয়, পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আগামী বছর থেকে পুরো পরীক্ষা কম্পিউটারভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
তার দাবি, সরকার ও বিভিন্ন রাজ্যের প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুনঃপরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৬ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলেও বহু মেধাবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী সফল হয়েছে।
‘দায়িত্ব এড়াইনি’: পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান উল্লেখ করেন, শুরু থেকেই তিনি ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং কখনও সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। তার ভাষায়, কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন পরীক্ষা মাফিয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্বশীল কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি তাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছে বলেও উল্লেখ করেন।
ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সম্মান: ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, ভারতের গণতন্ত্রের শক্তির ওপর তার আস্থা অটুট। দেশের তরুণদের তিনি শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নয়, বরং নতুন ভারতের নির্মাতা হিসেবে দেখেন।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক আন্দোলনের কারণে যাতে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতায় না পড়ে এবং তারা আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে—এই বিবেচনায় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ: পদত্যাগপত্রের শেষ অংশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মন্ত্রিসভার সহকর্মী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তার সঙ্গে কাজ করা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
তিনি বলেন, সরকারি পদে না থাকলেও দেশের সেবা করা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। ভবিষ্যতেও ভারতের জনগণ, ওড়িশার মানুষ এবং দেশের তরুণদের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ভারতের শিক্ষা খাত ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার দিকেই নজর সবার।
দেশ ডেস্ক 









