সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখনই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা থেকে বিরত থাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়া আরও বিলম্বিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আইএমএফের সঙ্গে আসন্ন আলোচনার ফলাফলের ওপর। আগামী অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সরকারি সূত্র জানায়, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে রাজস্ব আদায়ের বর্তমান অবস্থা, সরকারি ব্যয়ের চাপ, নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থের বিষয়টি তুলে ধরা হলে তা আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অর্থনীতির সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকেও বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি মাসে বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে সরকারি বেতন ও ভাতা ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সেখানে আইএমএফের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বহন করার মতো শক্তিশালী নয়।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষক সহায়তা, পরিবারভিত্তিক বিভিন্ন ভর্তুকি এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হয়নি। এ অবস্থায় নতুন পে-স্কেল চালু করলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই সংস্থাটি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে সরকার পে-স্কেলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। বরং জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি সংশোধিত প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি সেই সুপারিশ চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিয়েছে।
সরকারের ভেতরে এখন বিকল্প কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে। আর্থিক চাপ কমাতে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় অথবা সীমিত আকারে বাস্তবায়নের মতো বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতায়াত ভাতা পুনর্নির্ধারণ এবং অন্যান্য ভাতাও পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেলের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তাই নতুন পে-স্কেল সময়ের দাবি হলেও এটি বাস্তবায়নের আগে সরকারের রাজস্ব আহরণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অন্যথায় অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে, যা বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম পে-স্কেলের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে অর্থনীতির সক্ষমতা, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনার ফলাফলের ওপর। অক্টোবরের বৈঠকের পরই এ বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশ প্রতিবেদক 















