বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক আবারও সংবেদনশীল এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দিল্লিতে আয়োজিত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনলাইন সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
দ্য ডিপ্লোমেটের অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মনে করছে-বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতের রাজধানীতে এমন আয়োজনের সুযোগ দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে প্রচেষ্টা চলছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগে থেকেই ভারত সরকারকে জানানো হয়েছিল, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বা জনসম্মুখে উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এরপরও দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আয়োজন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি অসম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ভারত জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি সরকারি উদ্যোগে হয়নি এবং এতে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, রাজধানী দিল্লির মতো সংবেদনশীল স্থানে এমন একটি আয়োজন প্রশাসনের নীরব সম্মতি ছাড়া কতটা সম্ভব—সেই বিতর্ক এখনো থামেনি।
দ্য ডিপ্লোমেটের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থান করেও শেখ হাসিনার ধারাবাহিক রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য সহজ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরেন, তাহলে বর্তমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতের রায় এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—সব মিলিয়ে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তারা বলছেন-উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ঢাকার সহযোগিতা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটে ডিজেল সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণও দিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ দিকে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় একটি পরীক্ষা হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সমন্বয় এই ইস্যুতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা কাটিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে এসব উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি সম্প্রতি বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, অবকাঠামো, বন্দর, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতের আস্থা পুনর্গঠন প্রয়োজন।
দুই দেশের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক সংযম ও পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ চাইছে, ভারতের মাটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা না হোক। অন্যদিকে ভারতও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত স্বার্থ বজায় রাখতে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক যদি দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া নতুন আস্থার পরিবেশ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তবে গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ যদি এগিয়ে যায়, তাহলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ব্রেকিং নিউজ
হাসিনার বক্তব্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তাপ
-
দেশ ডেস্ক - প্রকাশ : ০৯:৫৭:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- ৮০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
India Bangladesh Relations আন্তর্জাতিক রাজনীতি গঙ্গা পানি চুক্তি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তারেক রহমান তিস্তা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শেখ হাসিনা
জনপ্রিয়









