ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোতে নজরদারি বাড়াচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ত্রুটিপূর্ণ নকশা, নির্মাণে অনিয়ম, দুর্বল মাটি ও অনুমোদনের বাইরে ভবনের সম্প্রসারণ—এসব বিষয় চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি শুধু ভবনের উচ্চতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ভবনের নকশা, নির্মাণের মান, মাটির ধরন এবং নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীতে ভবনের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় একসঙ্গে সব ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তাই পর্যায়ক্রমে ভবনগুলোর র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করা হবে। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের আগে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ, যথাযথভাবে মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও নিতে হবে।
রাজধানীতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ছয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে সেটিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণ করা ভবনের ক্ষেত্রে যথাযথ কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়ারও সুযোগ নেই।
ভবনের নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদের দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু নকশায় স্বাক্ষর করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। নির্মাণকাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সেটিও তদারকির আওতায় থাকা উচিত। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান রিয়াজুল ইসলাম।
এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ভবন ও এলাকার ঝুঁকি শনাক্ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, শুধু রাজউককে দায়ী করে রাজধানীর ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলার বিভিন্ন কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে শুধু ভবনের কাঠামো বিবেচনা করলেই হবে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ভূমি ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ একটি বড় ঝুঁকি। এ ধরনের ভবন দ্রুত শনাক্ত করে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। সমন্বিত প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
আলোচনা সভায় ডুরার সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশ প্রতিবেদক 








