ঢাকা ০৫:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশি আলেমের ২৫ বছরের গবেষণায় তিরমিজি শরিফের ১৭ খণ্ডের আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশ

  • দেশ প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ০৫:০০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৩৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের হাদিস গবেষণায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মতিনের দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণা, পাঠদানের আলোকে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ নামে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের আলেমদের মতে, তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থটি বাংলাদেশি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমাদৃত সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ আয়োজিত ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিজি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক ইলমি সেমিনারে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের আলেম ও গবেষকরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি বলেন, ইমাম তিরমিজির জামে তিরমিজি হাদিস সংকলনের পাশাপাশি ইসলামী ফিকহ, মতপার্থক্য ও দলিল বিশ্লেষণেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁর ভাষায়, মাওলানা আব্দুল মতিন সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, নির্ভরযোগ্য সূত্র ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়ে একটি উচ্চমানের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে হাদিস পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তাঁর মতে, এটি শুধু ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়; বরং হাদিস শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাভিত্তিক রেফারেন্স।
নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গ্রন্থকার মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, ২০০১ সালে মালিবাগ মাদরাসায় পাঠদান শুরু করার পর থেকেই তিনি তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
তিনি জানান, অর্থসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে বই সংগ্রহ করে নোট তৈরি করতেন। পরে ধীরে ধীরে গবেষণার পরিধি বাড়তে থাকে। করোনা মহামারির সময় ধারাবাহিকভাবে গবেষণার সুযোগ পাওয়ায় কাজটি আরও এগিয়ে যায়।
তাঁর ভাষায়, প্রতিটি হাদিসের ব্যাখ্যা, শব্দগত বিশ্লেষণ, ফিকহি মতপার্থক্য এবং প্রাচীন ব্যাখ্যাগ্রন্থের তুলনামূলক আলোচনা যুক্ত করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও হাদিস গবেষক মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, তিরমিজি শরিফের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি হাদিসের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে সালাফের মানহাজ, মতভিন্নতার শিষ্টাচার এবং গবেষণার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।
জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার বলেন, একটি শব্দের ব্যাখ্যা নির্ধারণের জন্যও লেখক শত শত মূল গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। ভবিষ্যতে তিরমিজি শরিফ নিয়ে গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা জানান, প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পর দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা মান বজায় রেখে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রন্থটির সম্পাদনা, প্রুফ সংশোধন, রেফারেন্স যাচাই এবং মুদ্রণ—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণায় উৎসাহ দিতে অনুষ্ঠানে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।
সেমিনারে সৌদি আরবের ড. শায়খ আব্দুল আজিজ আলহাজ, দক্ষিণ আফ্রিকার শায়খ ইসহাক বানা, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানী এবং সিলেটের মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক সুরাইঘাটিসহ দেশ-বিদেশের একাধিক আলেম গ্রন্থটির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

প্রকাশনা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ বাংলাদেশি একজন আলেমের রচিত পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। বিশ্বের খ্যাতনামা আলেমদের মূল্যায়ন, বিস্তৃত সম্পাদকীয় পর্যালোচনা এবং দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থকে বাংলাদেশের ইসলামি গবেষণার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাদিস গবেষকদের মতে, আরবি ভাষায় রচিত এ ধরনের মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ আন্তর্জাতিক ইসলামি শিক্ষাঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণার সক্ষমতাকে আরও দৃশ্যমান করবে এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।

জনপ্রিয়

বাংলাদেশি আলেমের ২৫ বছরের গবেষণায় তিরমিজি শরিফের ১৭ খণ্ডের আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশ

প্রকাশ : ০৫:০০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের হাদিস গবেষণায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মতিনের দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণা, পাঠদানের আলোকে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ নামে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের আলেমদের মতে, তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থটি বাংলাদেশি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমাদৃত সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ আয়োজিত ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিজি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক ইলমি সেমিনারে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের আলেম ও গবেষকরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি বলেন, ইমাম তিরমিজির জামে তিরমিজি হাদিস সংকলনের পাশাপাশি ইসলামী ফিকহ, মতপার্থক্য ও দলিল বিশ্লেষণেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁর ভাষায়, মাওলানা আব্দুল মতিন সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, নির্ভরযোগ্য সূত্র ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়ে একটি উচ্চমানের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে হাদিস পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তাঁর মতে, এটি শুধু ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়; বরং হাদিস শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাভিত্তিক রেফারেন্স।
নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গ্রন্থকার মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, ২০০১ সালে মালিবাগ মাদরাসায় পাঠদান শুরু করার পর থেকেই তিনি তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
তিনি জানান, অর্থসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে বই সংগ্রহ করে নোট তৈরি করতেন। পরে ধীরে ধীরে গবেষণার পরিধি বাড়তে থাকে। করোনা মহামারির সময় ধারাবাহিকভাবে গবেষণার সুযোগ পাওয়ায় কাজটি আরও এগিয়ে যায়।
তাঁর ভাষায়, প্রতিটি হাদিসের ব্যাখ্যা, শব্দগত বিশ্লেষণ, ফিকহি মতপার্থক্য এবং প্রাচীন ব্যাখ্যাগ্রন্থের তুলনামূলক আলোচনা যুক্ত করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও হাদিস গবেষক মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, তিরমিজি শরিফের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি হাদিসের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে সালাফের মানহাজ, মতভিন্নতার শিষ্টাচার এবং গবেষণার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।
জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার বলেন, একটি শব্দের ব্যাখ্যা নির্ধারণের জন্যও লেখক শত শত মূল গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। ভবিষ্যতে তিরমিজি শরিফ নিয়ে গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা জানান, প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পর দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা মান বজায় রেখে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রন্থটির সম্পাদনা, প্রুফ সংশোধন, রেফারেন্স যাচাই এবং মুদ্রণ—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণায় উৎসাহ দিতে অনুষ্ঠানে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।
সেমিনারে সৌদি আরবের ড. শায়খ আব্দুল আজিজ আলহাজ, দক্ষিণ আফ্রিকার শায়খ ইসহাক বানা, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানী এবং সিলেটের মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক সুরাইঘাটিসহ দেশ-বিদেশের একাধিক আলেম গ্রন্থটির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

প্রকাশনা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ বাংলাদেশি একজন আলেমের রচিত পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। বিশ্বের খ্যাতনামা আলেমদের মূল্যায়ন, বিস্তৃত সম্পাদকীয় পর্যালোচনা এবং দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থকে বাংলাদেশের ইসলামি গবেষণার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাদিস গবেষকদের মতে, আরবি ভাষায় রচিত এ ধরনের মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ আন্তর্জাতিক ইসলামি শিক্ষাঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণার সক্ষমতাকে আরও দৃশ্যমান করবে এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।