ঢাকা ০৫:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাবারে ভয়ংকর ভেজাল, সবজিতে সিসা, মরিচে নিষিদ্ধ রং

যে খাবার মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার কথা, সেই খাবারই এখন হয়ে উঠছে নানা রোগের ঝুঁকির উৎস। চাল, ডাল, শাকসবজি, মসলা, তেল, মুড়ি, সস, আচার, মিষ্টি, পানি থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য—নিত্যদিনের খাবারের বড় একটি অংশে মিলছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু, নিষিদ্ধ রং ও রোগজীবাণু।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষার যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ সুদান ডাই, ডালডায় বিপজ্জনক মাত্রার ট্রান্স ফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া এবং বিভিন্ন এলাকার পানিতে ফেকাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোক্তার খাবার টেবিল—প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার না করলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা: নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা শাকসবজির নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে শাকসবজিতে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ০.৩ পিপিএমের মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু পরীক্ষিত নমুনায় সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম সিসা পাওয়া গেছে।
শুধু ভারী ধাতুই নয়, কিছু সবজির নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন সিসা ও ক্যাডমিয়ামের সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সিসা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ সুদান ডাই
বাংলাদেশের রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় মসলা মরিচের গুঁড়াতেও মিলেছে উদ্বেগজনক মাত্রার ভেজাল।
কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও বগুড়ার সংগৃহীত মরিচের গুঁড়ার নমুনায় নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং সুদান ডাই শনাক্ত হয়েছে। কক্সবাজারের একটি নমুনায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ১,২৪২.৩২৪ পিপিএম।
সুদান ডাই খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। দীর্ঘদিন এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান গ্রহণ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডালডায় অনুমোদিত মাত্রার বহু গুণ ট্রান্স ফ্যাট: ডালডা ও অন্যান্য চর্বিজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক তথ্য। কুমিল্লার একটি ডালডার নমুনায় ৩০.৯৮ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে, যেখানে অনুমোদিত সীমা মাত্র ২ শতাংশ।
ভোলার একটি নমুনায় ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে ২৩.৯৩ শতাংশ এবং পাবনার একটি নমুনায় ২০.৫৩ শতাংশ।
অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
মুড়িতে মিলেছে ইউরিয়া: জনপ্রিয় নাশতা মুড়িতেও পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক উপাদান। ঝালকাঠি থেকে সংগ্রহ করা একটি নমুনায় সর্বোচ্চ ৬,৭৫৮.৭ মিলিগ্রাম ইউরিয়া শনাক্ত হয়েছে। ফেনী, ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরার মুড়ির নমুনাতেও উচ্চমাত্রার ইউরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
খাদ্যে অননুমোদিতভাবে ইউরিয়া ব্যবহারের বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সস-আচারেও অতিরিক্ত রাসায়নিক: বাজারে থাকা বিভিন্ন সস ও আচারে সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত বেনজোয়িক অ্যাসিডের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিও ধরা পড়েছে।
সসের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমা ৭৫০ পিপিএম হলেও রংপুরের একটি নমুনায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ২৩,২৭২ পিপিএম। কুড়িগ্রাম ও ভোলার আচারেও অনুমোদিত সীমার তুলনায় বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড পাওয়া গেছে।
পানিতেও মলজাতীয় জীবাণু: নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি নিরাপদ পানিও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়ির পানির নমুনায় ফেকাল কলিফর্ম ও টোটাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।
দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ ফেকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়িতে এই সংখ্যা ৬০ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ।
এ ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি সাধারণত পানি মলজাতীয় দূষণের সংস্পর্শে আসার ইঙ্গিত দেয়।
রান্না করা খাবারেও জীবাণু: শুধু কাঁচা খাদ্যপণ্য নয়, রান্না করা খাবারের নমুনাতেও জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় মোরগ পোলাও, চিংড়ি ও ভাতের নমুনায় ই-কোলাই ও সালমোনেলা শনাক্ত হয়েছে।
এ ধরনের জীবাণু খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তেলেও নানা অনিয়ম: সরিষার তেলের কিছু নমুনায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অ্যাসিড ভ্যালু পাওয়া গেছে। লক্ষ্মীপুরের একটি নমুনায় অ্যাসিড ভ্যালু ছিল ৫.৩, যেখানে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩.০।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভোজ্যতেলের নমুনায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে। একটি নমুনায় ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ ছিল ৬.৬২ শতাংশ।
গুড়, জিলাপি ও মিষ্টিতেও রাসায়নিক:
রাজশাহী, গাজীপুর ও নাটোরের খেজুর ও আখের গুড়ের নমুনায় সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং সাবানজাতীয় সারফেস অ্যাক্টিভ এজেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের জিলাপির নমুনায়ও ক্ষতিকর সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট শনাক্ত হয়েছে।
ঘি, মধু ও দুধজাত পণ্যেও প্রশ্ন: খুলনা থেকে সংগৃহীত মধুর নমুনায় অতিরিক্ত সুক্রোজ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জেলার নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘির নমুনায় দুধের চর্বির পরিমাণ কম বা অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এসব পণ্য প্রকৃত ঘির মানদণ্ড পূরণ করেনি।
বরিশাল থেকে সংগৃহীত মিল্ক পাউডারের একটি নমুনায় সিসা শনাক্ত হওয়াও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান ও জরিমানা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের সচেতনতা—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, খাবারে ভেজাল শুধু একটি পণ্যের মান নষ্ট করে না; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাব্যয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে খাবার প্রয়োজন, সেটিই যদি ক্ষতিকর উপাদানে দূষিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
তার মতে, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ—প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের নিরাপদ ব্যবহার এবং ফসল বাজারজাতের আগে নির্ধারিত সময় অপেক্ষার বিষয়েও কার্যকর নির্দেশনা থাকা জরুরি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। যেখানে ভেজাল বা মানহীন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে জরিমানা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কারখানা বন্ধের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
তবে পর্যাপ্ত ল্যাব ও জনবল না থাকায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা কঠিন হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
খাবারে ভেজাল ঠেকাতে নজরদারি কতটা কার্যকর?
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ার বিষয়টি শুধু ভোক্তার জন্য সতর্কবার্তা নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও সামনে আনছে।

 

জনপ্রিয়

খাবারে ভয়ংকর ভেজাল, সবজিতে সিসা, মরিচে নিষিদ্ধ রং

প্রকাশ : ০৮:১৫:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

যে খাবার মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার কথা, সেই খাবারই এখন হয়ে উঠছে নানা রোগের ঝুঁকির উৎস। চাল, ডাল, শাকসবজি, মসলা, তেল, মুড়ি, সস, আচার, মিষ্টি, পানি থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য—নিত্যদিনের খাবারের বড় একটি অংশে মিলছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু, নিষিদ্ধ রং ও রোগজীবাণু।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষার যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ সুদান ডাই, ডালডায় বিপজ্জনক মাত্রার ট্রান্স ফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া এবং বিভিন্ন এলাকার পানিতে ফেকাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোক্তার খাবার টেবিল—প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার না করলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা: নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা শাকসবজির নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে শাকসবজিতে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ০.৩ পিপিএমের মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু পরীক্ষিত নমুনায় সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম সিসা পাওয়া গেছে।
শুধু ভারী ধাতুই নয়, কিছু সবজির নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন সিসা ও ক্যাডমিয়ামের সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সিসা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ সুদান ডাই
বাংলাদেশের রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় মসলা মরিচের গুঁড়াতেও মিলেছে উদ্বেগজনক মাত্রার ভেজাল।
কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও বগুড়ার সংগৃহীত মরিচের গুঁড়ার নমুনায় নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং সুদান ডাই শনাক্ত হয়েছে। কক্সবাজারের একটি নমুনায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ১,২৪২.৩২৪ পিপিএম।
সুদান ডাই খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। দীর্ঘদিন এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান গ্রহণ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডালডায় অনুমোদিত মাত্রার বহু গুণ ট্রান্স ফ্যাট: ডালডা ও অন্যান্য চর্বিজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক তথ্য। কুমিল্লার একটি ডালডার নমুনায় ৩০.৯৮ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে, যেখানে অনুমোদিত সীমা মাত্র ২ শতাংশ।
ভোলার একটি নমুনায় ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে ২৩.৯৩ শতাংশ এবং পাবনার একটি নমুনায় ২০.৫৩ শতাংশ।
অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
মুড়িতে মিলেছে ইউরিয়া: জনপ্রিয় নাশতা মুড়িতেও পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক উপাদান। ঝালকাঠি থেকে সংগ্রহ করা একটি নমুনায় সর্বোচ্চ ৬,৭৫৮.৭ মিলিগ্রাম ইউরিয়া শনাক্ত হয়েছে। ফেনী, ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরার মুড়ির নমুনাতেও উচ্চমাত্রার ইউরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
খাদ্যে অননুমোদিতভাবে ইউরিয়া ব্যবহারের বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সস-আচারেও অতিরিক্ত রাসায়নিক: বাজারে থাকা বিভিন্ন সস ও আচারে সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত বেনজোয়িক অ্যাসিডের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিও ধরা পড়েছে।
সসের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমা ৭৫০ পিপিএম হলেও রংপুরের একটি নমুনায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ২৩,২৭২ পিপিএম। কুড়িগ্রাম ও ভোলার আচারেও অনুমোদিত সীমার তুলনায় বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড পাওয়া গেছে।
পানিতেও মলজাতীয় জীবাণু: নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি নিরাপদ পানিও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়ির পানির নমুনায় ফেকাল কলিফর্ম ও টোটাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।
দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ ফেকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়িতে এই সংখ্যা ৬০ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ।
এ ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি সাধারণত পানি মলজাতীয় দূষণের সংস্পর্শে আসার ইঙ্গিত দেয়।
রান্না করা খাবারেও জীবাণু: শুধু কাঁচা খাদ্যপণ্য নয়, রান্না করা খাবারের নমুনাতেও জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় মোরগ পোলাও, চিংড়ি ও ভাতের নমুনায় ই-কোলাই ও সালমোনেলা শনাক্ত হয়েছে।
এ ধরনের জীবাণু খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তেলেও নানা অনিয়ম: সরিষার তেলের কিছু নমুনায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অ্যাসিড ভ্যালু পাওয়া গেছে। লক্ষ্মীপুরের একটি নমুনায় অ্যাসিড ভ্যালু ছিল ৫.৩, যেখানে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩.০।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভোজ্যতেলের নমুনায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে। একটি নমুনায় ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ ছিল ৬.৬২ শতাংশ।
গুড়, জিলাপি ও মিষ্টিতেও রাসায়নিক:
রাজশাহী, গাজীপুর ও নাটোরের খেজুর ও আখের গুড়ের নমুনায় সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং সাবানজাতীয় সারফেস অ্যাক্টিভ এজেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের জিলাপির নমুনায়ও ক্ষতিকর সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট শনাক্ত হয়েছে।
ঘি, মধু ও দুধজাত পণ্যেও প্রশ্ন: খুলনা থেকে সংগৃহীত মধুর নমুনায় অতিরিক্ত সুক্রোজ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জেলার নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘির নমুনায় দুধের চর্বির পরিমাণ কম বা অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এসব পণ্য প্রকৃত ঘির মানদণ্ড পূরণ করেনি।
বরিশাল থেকে সংগৃহীত মিল্ক পাউডারের একটি নমুনায় সিসা শনাক্ত হওয়াও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান ও জরিমানা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা, নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের সচেতনতা—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, খাবারে ভেজাল শুধু একটি পণ্যের মান নষ্ট করে না; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাব্যয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে খাবার প্রয়োজন, সেটিই যদি ক্ষতিকর উপাদানে দূষিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
তার মতে, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ—প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের নিরাপদ ব্যবহার এবং ফসল বাজারজাতের আগে নির্ধারিত সময় অপেক্ষার বিষয়েও কার্যকর নির্দেশনা থাকা জরুরি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। যেখানে ভেজাল বা মানহীন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে জরিমানা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কারখানা বন্ধের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
তবে পর্যাপ্ত ল্যাব ও জনবল না থাকায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা কঠিন হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
খাবারে ভেজাল ঠেকাতে নজরদারি কতটা কার্যকর?
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ার বিষয়টি শুধু ভোক্তার জন্য সতর্কবার্তা নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও সামনে আনছে।