ঢাকা ০৫:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় মাসে কতটা বদলেছে বাংলাদেশ?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন অর্থাৎ ছয় মাস পূর্ণ হলো। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি কিছু সংস্কার উদ্যোগ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগের ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি এখনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ছয় মাসে কোনো সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোর: ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি ৩১ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া ও যোগাযোগ খাতে বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগের পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা, কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দাবি, এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা: ক্ষমতা গ্রহণের সময় দুর্বল অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট ও বিনিয়োগের স্থবিরতা ছিল সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং উৎপাদনশীল খাতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার সংস্কারমুখী বাজেটের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরীর মতে, ছয় মাসের ভিত্তিতে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, সরকার সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
খাদ্য মজুত ও কৃষিতে গুরুত্ব: সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ঋণ ও খাদ্যসহায়তার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ, কম দামে খাদ্যসহায়তা এবং কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগকে সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্যের মজুত বর্তমানে ২৪ লাখ টনের বেশি। এই মজুত বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি: স্বাস্থ্য খাতে হেলথ কার্ড চালু এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
শিক্ষা খাতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে সরকার।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ: সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের চেষ্টা রয়েছে। তবে মাঠ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সমন্বয়হীনতা এখনো রয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, কারাগার থেকে পালানো আসামিদের গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অপরাধ দমনের বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয়তা: সরকারের প্রথম ছয় মাসে পররাষ্ট্রনীতিতেও বেশ কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরদার করার উদ্যোগও সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ।
জ্বালানি ও বৈশ্বিক সংকটের চাপ: সরকারের প্রথম ছয় মাসে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে সরকারকে।
নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগের বিষয়। ফলে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা।
কর্মসংস্থান ও বিদেশে শ্রমবাজার: বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় আগের সিন্ডিকেটভিত্তিক পদ্ধতি বাদ দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের হয়রানি ও প্রতারণা বন্ধ করা। এটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সাধারণ শ্রমিকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
উন্নয়ন প্রকল্পে গতি কতটা? সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, ঠিকাদার সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সরকারপ্রধান এসব জটিলতা কমাতে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দেশনা দিলেও আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তহীনতা পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরীক্ষা: অর্থনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারের কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলোও রয়েছে। তবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরুতে কিছু দূরত্ব থাকলেও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে তা কমানোর চেষ্টা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকারের কার্যক্রমে ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, মানুষের প্রত্যাশা এখনো অনেক বেশি এবং জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে। তাঁর মতে, মানুষের আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং বিদেশিরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে,সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ এই আস্থাকে টেকসই উন্নয়নে রূপ দেওয়া। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নত করা, দুর্নীতি কমানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা।

Tag :
জনপ্রিয়

ছয় মাসে কতটা বদলেছে বাংলাদেশ?

প্রকাশ : ০৯:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন অর্থাৎ ছয় মাস পূর্ণ হলো। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি কিছু সংস্কার উদ্যোগ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগের ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি এখনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ছয় মাসে কোনো সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোর: ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি ৩১ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া ও যোগাযোগ খাতে বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগের পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা, কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দাবি, এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা: ক্ষমতা গ্রহণের সময় দুর্বল অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট ও বিনিয়োগের স্থবিরতা ছিল সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং উৎপাদনশীল খাতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার সংস্কারমুখী বাজেটের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরীর মতে, ছয় মাসের ভিত্তিতে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, সরকার সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
খাদ্য মজুত ও কৃষিতে গুরুত্ব: সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ঋণ ও খাদ্যসহায়তার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ, কম দামে খাদ্যসহায়তা এবং কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগকে সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্যের মজুত বর্তমানে ২৪ লাখ টনের বেশি। এই মজুত বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি: স্বাস্থ্য খাতে হেলথ কার্ড চালু এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
শিক্ষা খাতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে সরকার।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ: সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের চেষ্টা রয়েছে। তবে মাঠ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সমন্বয়হীনতা এখনো রয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, কারাগার থেকে পালানো আসামিদের গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অপরাধ দমনের বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয়তা: সরকারের প্রথম ছয় মাসে পররাষ্ট্রনীতিতেও বেশ কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরদার করার উদ্যোগও সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ।
জ্বালানি ও বৈশ্বিক সংকটের চাপ: সরকারের প্রথম ছয় মাসে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে সরকারকে।
নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগের বিষয়। ফলে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা।
কর্মসংস্থান ও বিদেশে শ্রমবাজার: বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় আগের সিন্ডিকেটভিত্তিক পদ্ধতি বাদ দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের হয়রানি ও প্রতারণা বন্ধ করা। এটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সাধারণ শ্রমিকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
উন্নয়ন প্রকল্পে গতি কতটা? সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, ঠিকাদার সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সরকারপ্রধান এসব জটিলতা কমাতে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দেশনা দিলেও আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তহীনতা পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরীক্ষা: অর্থনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারের কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলোও রয়েছে। তবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরুতে কিছু দূরত্ব থাকলেও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে তা কমানোর চেষ্টা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকারের কার্যক্রমে ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, মানুষের প্রত্যাশা এখনো অনেক বেশি এবং জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে। তাঁর মতে, মানুষের আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং বিদেশিরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে,সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ এই আস্থাকে টেকসই উন্নয়নে রূপ দেওয়া। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নত করা, দুর্নীতি কমানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা।