ভারতের নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছে পুলিশ। আয়োজকদের দাবি, দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটির জন্য অনুমতি দেয়নি। আর পুলিশ বলছে, কিছু বিতর্কের কারণে এই অনুষ্ঠান অনুমোদিত নয়।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু এ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি গত শনিবার সন্ধ্যায় হওয়ার কথা ছিল। বেলজিয়ামভিত্তিক হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সেমিনার-কাম-প্রেস কনফারেন্স হিসেবে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এফসিসির পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি নথিতে দেখা যায়, অনুষ্ঠানের অনুমতির বিষয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘তথ্য অনুযায়ী কিছু বিতর্কের কারণে’ অনুষ্ঠানটি অনুমোদন করা হচ্ছে না। তিলক মার্গ থানার সিলযুক্ত ওই নথির একটি ছবি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে।
এফসিসি সূত্রের বরাতে জানা যায়, অনুষ্ঠানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুক্রবার সন্ধ্যায় সংগঠনটির ব্যবস্থাপনা দলের একজন সদস্য তিলক মার্গ থানায় যান। সেখানে অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু, অংশগ্রহণকারী ও সময়সূচি সম্পর্কে পুলিশকে বিস্তারিত জানানো হয়। পরে পুলিশ অনুষ্ঠানটির অনুমতি না দেওয়ার কথা জানায়।
এরপর এফসিসির সদস্যদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় অনুষ্ঠানটি বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়। এফসিসি ম্যানেজার বলেন, দিল্লি পুলিশের সিদ্ধান্তের কারণে নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি এবং পরিস্থিতিটি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
কারা ছিলেন আলোচনায়: আয়োজকদের প্রকাশিত আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে মোট ১০ জনের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন সদস্য, একজন রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী, কয়েকজন কূটনীতিক, গবেষক ও অধিকারকর্মী ছিলেন।
প্যানেলে ছিলেন চেক রাজনীতিক ওন্দ্রেজ দস্তাল, জার্মান কূটনীতিক পিটার ফারেনহোল্টজ, বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী, বাংলাদেশি আইন বিশেষজ্ঞ সেলিম মাহমুদ, নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ, সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের মহাসচিব গোলাম জিলানি।
এফসিসির সভাপতি ওয়ায়েল আওয়াদ বলেন, অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। তবে দিল্লি পুলিশ কেন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) শচীন শর্মা পুলিশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্যানেল আয়োজনের জন্য এফসিসির পুলিশের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই এবং পুলিশ কোনো অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করেনি।
তবে পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে প্রকাশ্যে আসা নথির মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। নথিতে অনুষ্ঠানটির বিষয়ে পুলিশের অনুমোদন না দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এফসিসির সহকারী ম্যানেজারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে পাঠানো চিঠিতে ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়।
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর নতুন বিতর্ক : এর আগে একই ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
এফসিসির একটি সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সমালোচনা করা হয়েছিল। সূত্রটির মতে, সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে ওই প্রেক্ষাপটের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একই সূত্র মনে করছে, নতুন অনুষ্ঠানের আলোচকদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব থাকায় পুলিশের আপত্তির কারণ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
দিল্লি প্রতিনিধি 








