ঢাকা ০৫:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রার্থী দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে।

ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হওয়ার সুযোগ থাকছে না। যদিও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত, তবু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্তকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার চর্চা হিসেবে দেখছে ১১ দলীয় ঐক্য।

রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সংস্কারের পথে এগোলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মিলে রাষ্ট্রপতি পদে একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে পৃথক প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে।

কেন প্রার্থী দিল জামায়াত : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাব বিরোধী জোটের পক্ষে অনুকূলে না থাকলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী দলের অধিকার। গণতন্ত্রে শুধু জয়-পরাজয়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অধিকার চর্চারও গুরুত্ব রয়েছে। বিরোধী দল কোনো নির্বাচনেই সরকারকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছেড়ে দিতে চায় না।

জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি আবদুল হালিমও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেখানে বিরোধী দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ রয়েছে, সেখানে দলটি সেই সুযোগ কাজে লাগাবে।

এর আগে শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।

সংসদে সংখ্যার হিসাবে বিএনপি এগিয়ে : ৩৪৯ সদস্যের জাতীয় সংসদে জামায়াত জোটের সদস্যসংখ্যা ৯০। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কার হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটার থাকছেন।

অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন আটজন। ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন। বাকি ২৪৭ জন সংসদ সদস্য বিএনপির।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার ফলে নির্বাচনে অন্তত আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হচ্ছে।

সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে: বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছিল।

সে সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের সমর্থনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। এরপর অনুষ্ঠিত সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। গত ৬ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।

তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে রোববার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর নুরুল ইসলাম মনি বলেন, একই প্রার্থীর জন্য দুটি ফরম নেওয়া হয়েছে, যাতে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা বাদ পড়ার ঘটনা না ঘটে। তিনি জানান, তফসিল অনুযায়ী বিএনপি মনোনয়নপত্র জমা দেবে।

ফলে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দীর্ঘ সময় পর সংসদে বিরোধী দলের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে যাচ্ছে।

জনপ্রিয়

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই

প্রকাশ : ০৮:৫২:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রার্থী দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে।

ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হওয়ার সুযোগ থাকছে না। যদিও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত, তবু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্তকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার চর্চা হিসেবে দেখছে ১১ দলীয় ঐক্য।

রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সংস্কারের পথে এগোলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মিলে রাষ্ট্রপতি পদে একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে পৃথক প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে।

কেন প্রার্থী দিল জামায়াত : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাব বিরোধী জোটের পক্ষে অনুকূলে না থাকলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী দলের অধিকার। গণতন্ত্রে শুধু জয়-পরাজয়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অধিকার চর্চারও গুরুত্ব রয়েছে। বিরোধী দল কোনো নির্বাচনেই সরকারকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছেড়ে দিতে চায় না।

জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি আবদুল হালিমও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেখানে বিরোধী দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ রয়েছে, সেখানে দলটি সেই সুযোগ কাজে লাগাবে।

এর আগে শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।

সংসদে সংখ্যার হিসাবে বিএনপি এগিয়ে : ৩৪৯ সদস্যের জাতীয় সংসদে জামায়াত জোটের সদস্যসংখ্যা ৯০। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কার হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটার থাকছেন।

অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন আটজন। ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন। বাকি ২৪৭ জন সংসদ সদস্য বিএনপির।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার ফলে নির্বাচনে অন্তত আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হচ্ছে।

সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে: বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছিল।

সে সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের সমর্থনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। এরপর অনুষ্ঠিত সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। গত ৬ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।

তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে রোববার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর নুরুল ইসলাম মনি বলেন, একই প্রার্থীর জন্য দুটি ফরম নেওয়া হয়েছে, যাতে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা বাদ পড়ার ঘটনা না ঘটে। তিনি জানান, তফসিল অনুযায়ী বিএনপি মনোনয়নপত্র জমা দেবে।

ফলে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দীর্ঘ সময় পর সংসদে বিরোধী দলের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে যাচ্ছে।