ঢাকা ১১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে সরকারের তিন কৌশল!

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ০৭:০৬:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বন্ধ কারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে-সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলগুলো হচ্ছে- প্রথমে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, এরপর উৎপাদন ও বিনিয়োগের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং শেষ পর্যন্ত দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির পুনর্গঠন। এই তিন ধাপের পরিকল্পনাকে ‘রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
গত ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত সমঝোতা তৈরি হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ কারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে বাড়াতে হবে উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে হবে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিন ধাপের কৌশল:
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং তৃতীয় ধাপে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রথম ধাপে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কমানো।

দ্বিতীয় ধাপে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বাধা দূর করা, বন্ধ বা সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা এবং উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তৃতীয় ধাপে শিল্পের বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এই তিন ধাপের সমন্বিত বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তবে প্রতিটি ধাপের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির ওপর।

ব্যাংক খাতে সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা:
অর্থনীতির পরিবর্তনে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে ব্যাংক খাতের সংস্কার। কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠে। কিন্তু ব্যাংকের অর্থ অনাদায়ী হয়ে পড়লে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয় এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পাঁচ বছর মেয়াদি ১৩ দফা ব্যাংকিং সংস্কার রোডম্যাপে খেলাপি ঋণ আদায়, বড় ঋণখেলাপিদের জবাবদিহি, ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ২২টি ব্যাংকের সম্মিলিত সঞ্চিত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা এবং ১২টি ব্যাংককে দেওয়া তারল্য সহায়তার পরিমাণ ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম বন্ধ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা যথেষ্ট নয়; আদায় করা অর্থের পরিমাণ, নতুন ঋণখেলাপি সৃষ্টির হার এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহের পরিবর্তন দিয়েই সংস্কারের সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে।

রাজস্ব আয় বাড়িয়ে উন্নয়নের অর্থ জোগান:
অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আয় বাড়ানো। রাজস্ব কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায়। একই প্রতিবেদনে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতাকে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে করব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং বড় আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর পরিশোধ নিশ্চিত হয়।

সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাজস্ব বাড়ানো, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগ বাড়ানো ও বন্ধ কারখানা চালু:
অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর মধ্য দিয়েই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেতে পারে।
সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বন্ধ কারখানা চালু করার বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থায়ন দ্রুত সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগের সুফল দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরের উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, জমির ব্যবস্থা , বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানি-রপ্তানির সহজ প্রক্রিয়া, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় হয়রানি কমানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানভেদে সমস্যার কারণ নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অর্থায়ন, কোথাও ব্যবস্থাপনা, কোথাও বাজারের অভাব, আবার কোথাও জ্বালানি বা কাঁচামালের সংকট প্রধান বাধা হতে পারে। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধান না করলে সরকারি সহায়তা স্থায়ী ফল নাও দিতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা:
অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে বাজারে পণ্যের দাম, পরিবারের আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, সংরক্ষণাগার ও হিমাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক বাজার আচরণের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন। বাজার তদারকিতে যেন প্রকৃত ব্যবসায়ী ও সরবরাহব্যবস্থা অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে দিকেও নজর রাখতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বা বাজার তদারকির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদন, সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার এবং সরকারি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডে সামাজিক সুরক্ষা:
অর্থনৈতিক সংস্কারের সময় নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভর্তুকি বা সরকারি সহায়তা কমানো কিংবা করব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রভাব দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।
এ কারণে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ মনে করে, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট কমাতে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সহায়তার পরিমাণ, নিয়মিত অর্থপ্রদান এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর ওপর। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে আর্থিক অবস্থা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষক কার্ডের সঙ্গে কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র, ফসল সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে বাজারজাতকরণের সুযোগ যুক্ত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা:
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এই চাপ কমাতে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় কমানো এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সংস্কার পরিকল্পনা:
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। তবে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া নয়, বরং অর্থনীতির দুর্বলতা দূর করে সেই সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় বিষয়।

গত ১২ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার-সংক্রান্ত শর্তগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কারের সময়সূচি নির্ধারণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাইলেও বাস্তবায়নের গতি ও ক্রম নির্ধারণে নিজস্ব অগ্রাধিকার বজায় রাখতে চায়। তবে রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, ভর্তুকির কার্যকারিতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি না হলে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সহায়তা উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থের জোগান দিতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজন দেশীয় নীতিগত সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই হবে না, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের নীতিগত নিশ্চয়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ অর্থায়ন এবং সরকারের ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে করব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথ তৈরি হবে।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি তার সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিনিয়োগের ফলে যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, শ্রমিকের আয় বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বৈধ পথে দেশে আনা সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো অর্থনীতির বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ শক্তিশালী করতে পারে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি শিক্ষা, শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানোও জরুরি। শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, কতটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, প্রকৃত মজুরি কতটা বাড়ছে এবং দারিদ্র্য কমছে কি না—এসব সূচক দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।

বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা:
বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার পরিকল্পনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা—প্রতিটি উদ্যোগই অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরলে বিনিয়োগের অর্থায়ন সহজ হতে পারে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা মিলতে পারে। আবার রাজস্ব আয় বাড়লে সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় করার সক্ষমতা অর্জন করে। তবে রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হবে।

অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে সরকারের তিন কৌশল!

প্রকাশ : ০৭:০৬:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বন্ধ কারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে-সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলগুলো হচ্ছে- প্রথমে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, এরপর উৎপাদন ও বিনিয়োগের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং শেষ পর্যন্ত দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির পুনর্গঠন। এই তিন ধাপের পরিকল্পনাকে ‘রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
গত ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত সমঝোতা তৈরি হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ কারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে বাড়াতে হবে উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে হবে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিন ধাপের কৌশল:
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং তৃতীয় ধাপে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রথম ধাপে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কমানো।

দ্বিতীয় ধাপে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বাধা দূর করা, বন্ধ বা সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা এবং উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তৃতীয় ধাপে শিল্পের বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এই তিন ধাপের সমন্বিত বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তবে প্রতিটি ধাপের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির ওপর।

ব্যাংক খাতে সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা:
অর্থনীতির পরিবর্তনে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে ব্যাংক খাতের সংস্কার। কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠে। কিন্তু ব্যাংকের অর্থ অনাদায়ী হয়ে পড়লে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয় এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পাঁচ বছর মেয়াদি ১৩ দফা ব্যাংকিং সংস্কার রোডম্যাপে খেলাপি ঋণ আদায়, বড় ঋণখেলাপিদের জবাবদিহি, ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ২২টি ব্যাংকের সম্মিলিত সঞ্চিত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা এবং ১২টি ব্যাংককে দেওয়া তারল্য সহায়তার পরিমাণ ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম বন্ধ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা যথেষ্ট নয়; আদায় করা অর্থের পরিমাণ, নতুন ঋণখেলাপি সৃষ্টির হার এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহের পরিবর্তন দিয়েই সংস্কারের সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে।

রাজস্ব আয় বাড়িয়ে উন্নয়নের অর্থ জোগান:
অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আয় বাড়ানো। রাজস্ব কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায়। একই প্রতিবেদনে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতাকে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে করব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং বড় আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর পরিশোধ নিশ্চিত হয়।

সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাজস্ব বাড়ানো, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগ বাড়ানো ও বন্ধ কারখানা চালু:
অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর মধ্য দিয়েই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেতে পারে।
সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বন্ধ কারখানা চালু করার বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থায়ন দ্রুত সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগের সুফল দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরের উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, জমির ব্যবস্থা , বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানি-রপ্তানির সহজ প্রক্রিয়া, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় হয়রানি কমানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানভেদে সমস্যার কারণ নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অর্থায়ন, কোথাও ব্যবস্থাপনা, কোথাও বাজারের অভাব, আবার কোথাও জ্বালানি বা কাঁচামালের সংকট প্রধান বাধা হতে পারে। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধান না করলে সরকারি সহায়তা স্থায়ী ফল নাও দিতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা:
অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে বাজারে পণ্যের দাম, পরিবারের আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, সংরক্ষণাগার ও হিমাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক বাজার আচরণের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন। বাজার তদারকিতে যেন প্রকৃত ব্যবসায়ী ও সরবরাহব্যবস্থা অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে দিকেও নজর রাখতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বা বাজার তদারকির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদন, সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার এবং সরকারি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডে সামাজিক সুরক্ষা:
অর্থনৈতিক সংস্কারের সময় নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভর্তুকি বা সরকারি সহায়তা কমানো কিংবা করব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রভাব দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।
এ কারণে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ মনে করে, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট কমাতে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সহায়তার পরিমাণ, নিয়মিত অর্থপ্রদান এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর ওপর। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে আর্থিক অবস্থা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষক কার্ডের সঙ্গে কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র, ফসল সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে বাজারজাতকরণের সুযোগ যুক্ত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা:
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এই চাপ কমাতে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় কমানো এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সংস্কার পরিকল্পনা:
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। তবে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া নয়, বরং অর্থনীতির দুর্বলতা দূর করে সেই সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় বিষয়।

গত ১২ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার-সংক্রান্ত শর্তগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কারের সময়সূচি নির্ধারণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাইলেও বাস্তবায়নের গতি ও ক্রম নির্ধারণে নিজস্ব অগ্রাধিকার বজায় রাখতে চায়। তবে রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, ভর্তুকির কার্যকারিতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি না হলে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সহায়তা উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থের জোগান দিতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজন দেশীয় নীতিগত সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই হবে না, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের নীতিগত নিশ্চয়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ অর্থায়ন এবং সরকারের ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে করব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথ তৈরি হবে।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি তার সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিনিয়োগের ফলে যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, শ্রমিকের আয় বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বৈধ পথে দেশে আনা সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো অর্থনীতির বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ শক্তিশালী করতে পারে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি শিক্ষা, শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানোও জরুরি। শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, কতটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, প্রকৃত মজুরি কতটা বাড়ছে এবং দারিদ্র্য কমছে কি না—এসব সূচক দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।

বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা:
বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার পরিকল্পনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা—প্রতিটি উদ্যোগই অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরলে বিনিয়োগের অর্থায়ন সহজ হতে পারে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা মিলতে পারে। আবার রাজস্ব আয় বাড়লে সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় করার সক্ষমতা অর্জন করে। তবে রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হবে।