থেমে থেমে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। ফলে মশার প্রকোপও বাড়ছে। রাজধানী থেকে শুরু হয়ে গ্রামেও এখন ডেঙ্গুর সমান প্রকোপ। ফলে ভয়াবহ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কষ্টসাধ্য হবে বলে জানিযেছেন কিটতত্ত্ববিদরা। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত একদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১০৮ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৮৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) চারজন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) তিনজন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন, ঢাকা দ¶িণ সিটি করপোরেশনের ১০ জন এবং রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন রয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে ৭৫ ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরে এ যাবৎ মোট ৪ হাজার ৯০৭ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের ১২ জুন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪১১ জন। এর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ নারী রয়েছেন।
সদ্য সমাপ্ত এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা নগরীতে প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি এডিস মশার সন্ধানে অনুসন্ধান চালায় একদল গবেষক। ঈদুল আজহার ছুটির আগের দুই সপ্তাহ ধরে চলা তাদের জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১৫টি বাড়ির মধ্যে ৭ থেকে ৮টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা বা শূককিট পাওয়া গেছে। এডিস মশা ডেঙ্গু ছড়ায়। লার্ভা জরিপে যে বিষয়টির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হলো লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপ করা। এ ক্ষেত্রে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো ‘ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই)’। যদি এই ইনডেক্সের পরিমাণ ২০-এর বেশি হয়, তবে তা আশঙ্কাজনক বলে বিবেচিত হয়। এখন এই জরিপ অনুযায়ী, ব্রুটো ইনডেক্সের হার ৫০ থেকে ৬০।
এই জরিপের নেতৃত্ব দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কিটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, এবার এডিস মশার বংশবৃদ্ধির হার মারাত্মক। মশার বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। দক্ষিণ ও উত্তর দুই সিটিতেই এডিস মশার প্রকোপ সমান হারে বাড়ছে। তাই ডেঙ্গু রোধে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, বৃষ্টি হলেই ডেঙ্গু বাড়ে। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়টাই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ডেঙ্গু থেকে বাঁচার প্রধানতম উপায় হলো এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এখন এডিস মশা থেকে বাঁচতে হলে ভবনের ভেতরে বা আশপাশে যেন পানি না জমে, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। জমলে ফেলে দিতে হবে। ঘরের ভিতরেও যেন পানি না জমে। প্লাস্টিকের ড্রাম বা মাটির মটকিতে পানি সংরক্ষণ করলে এসব পানি তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। তিন দিনও রাখতে হবে ঢাকনা দিয়ে। না হলে এডিস মশা এসে ডিম পাড়বে।
এখনকার আবহাওয়া পরিস্থিতি বড় সংক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এবার থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আবার ভ্যাপসা গরম। এটা ডেঙ্গুর এডিস মশা বৃদ্ধির একেবারে আদর্শ অবস্থা।
শুধু এডিস নয়, বিশেষ করে রাজধানীতে এ বছর কিউলেক্স মশারও ব্যাপক বিস্তার ঘটে। গত মার্চে রাজধানীর গুলশানে মশার অবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সাইফুর রহমান। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সর্বনিম্ন ৯০০ থেকে ২ হাজার মশা পাওয়া যায় ওই এলাকায়। সাইফুর রহমান বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ২০০-এর মতো মশা পাওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার। মার্চ মাসের পর বৈশাখী ঝড়বৃষ্টির কারণে কিউলেক্স কিছু কমে আসে। কিন্তু এখন ডেঙ্গু এবং কিউলেক্স উভয়ই বেড়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি এবার যেমন, তাতে ডেঙ্গুর একেবারে সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দ¶িণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রস্তুতি আছে। বাজেটও আছে। এডিস মশার বিস্তার রোধকে বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সর্বোচ্চ গুরত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এডিস মশার বিস্তার রোধে তাৎক্ষণিক ফলাফল লাভে ১৪ জুন ২০২৫ থেকে ডিএসসিসি এলাকায় এডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমে (ফগার মেশিন দ্বারা পরিচালিত) বর্তমানে ব্যবহৃত ৩০ লিটার কীটনাশকের পরিবর্তে দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থাৎ ৬০ লিটার কীটনাশক প্রতিদিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মশক কর্মীদের সকাল ও বিকালের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, সঠিক অনুপাতে কীটনাশক প্রয়োগ যাচাইকরণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং মশককর্মী দ্বারা বাড়ির ভিতর, আঙিনা ও ছাদের জমানো পানিসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে অঞ্চল ভিত্তিক ডেঙ্গু মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও দ্রুত সময়ের মধ্যে কিটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে নগর ভবনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক সেমিনার আয়োজন করা হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, বরিশাল বিভাগে গত একদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক কিশোরীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে বিভাগে চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ৭ জনের মৃত্যু হলো। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার সুঠিয়া কাঠি গ্রামের ইসরাত জাহান (২০), বরগুনা জেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারপাড়া গ্রামের চাঁন মিয়া (৭৫) ও বরগুনা সদর উপজেলার থানা পাড়া এলাকার ঘোসাই দাস (৮৫) মারা যান। এছাড়া বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ১২৪ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বিভাগের ছয় জেলার সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ৩২৪ রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে বরিশাল জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১০০, পটুয়াখালীতে ১৮, পিরোজপুরে ৭, বরগুনায় ১৯৩ ও ঝালকাঠিতে ছয়জন রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন। এদিকে চলতি বছর পুরো বিভাগে ৭ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ জন ও বরগুনায় ৫ জন মারা যান।
উল্লেখ্য, গত বছর এ সময় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩১। এ সময় মারা গিয়েছিলেন ৩৭ জন। দেশে এযাবৎকালে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ৮ জুন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছিলেন ২ হাজার ৮৫৪ জন। আর মারা গিয়েছিলেন ২১ জন। পুরো বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। আর মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন। দেশে ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুতে নতুন করে প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর পরবর্তী ২৩ বছরে এত সংক্রমণ বা মৃত্যু হয়নি, যা ২০২৩ সালে হয়েছিল।
দেশ প্রতিবেদক 









