যেনতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে বির্নিমাণ করাই দলটির লক্ষ্য। গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন জুলাই আন্দোলনের নায়করা। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে দলটি।
সদ্য সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আখতার হোসেনের নেতৃত্বে এনসিপির ১৫১ সদস্য ঘোষণা করা হয়েছে। শহীদ মো. ইসমাইল হাসান রাব্বির বোন মিম আক্তার দলটির নাম ঘোষণা করেন। মিম আক্তার বলেন, আপনাদের মনে আছে, গত ৫ আগস্ট দুই বোনের কাঁধে ভাইয়ের লাশ৷ সে দুই বোনের মধ্যে আমি একজন। ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটে নাই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি ঘোষণা করছি।
এ সময় তিনি আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেনের নাম ঘোষণা করেন। এরপর আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে নতুন এ রাজনৈতিক দলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন। কমিটিতে মোট ১৫১টি পদ রয়েছে। আখতার হোসেন জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব। ডা. তাসনীম জারা ও নাহিদা সারোয়ার সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নতুন দলের প্রধান সমন্বয়কারী, আবদুল হান্নান মাসউদকে যুগ্ম সমন্বয়ক, হাসনাত আবদুল্লাহকে মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল), সারজিস আলমকে মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও সালেহউদ্দিন সিফাতকে দপ্তর সম্পাদক পদে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এদিন বিকেল ৪টা ২০মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর একে একে পাঠ করা হয় গীতা, ত্রিপিটক ও বাইবেল। পরে পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত। সবাই দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতে অংশ নেন। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
আত্মপ্রকাশের অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারী ছাত্র–জনতা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সংগ্রামী সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই হবে হবে না। আমরা বাংলাদেশকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে বির্নিমাণ করব। আমরা সামনের কথা বলতে চাই। পেছনের ইতিহাস অতিক্রম করে সম্ভাবনার বাংলাদেশের কথা বলতে চাই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘তুমি কে, আমি কে, বিকল্প, বিকল্প’ স্লোগানটি তুলে ধরে বলেন নাহিদ ইসলাম বলেন, বিকল্পের জায়গা থেকে এই নতুন দলের আত্মপ্রকাশ। আজকের মঞ্চ থেকে শপথ, বাংলাদেশকে বিভাজিত করা যাবে না।
এরপর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাহিদ ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘জুলাই ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে, আমরা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এই মর্মে ঘোষণা করছি— আমরা হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় বঙ্গীয় বদ্বীপের জনগোষ্ঠী হিসেবে এক সমৃদ্ধ ও স্বকীয় সংস্কৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে। তবে শোষণ ও বৈষম্য থেকে এ দেশের গণমানুষের মুক্তি মেলেনি। ফলে দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের জনগণকে বারবার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে— এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে পারিনি। বরং বিগত ১৫ বছর দেশে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।’
‘জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি। জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিল, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।’
‘আমরা মনে করি জুলাই ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, তাঁরা কৃষি-সেবা-উৎপাদন খাতের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান, যেটা হবে স্বনির্ভর, আয়-বৈষম্যহীন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অর্থনীতিতে সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না; বরং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে তাঁদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র। বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করব এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে জোর দিয়ে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি টেকসই, আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলব।’
ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঙ্ক্ষিত সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। ‘আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ—আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক অধরা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা’ বলে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
মাহমুদুল করিম খান 









