সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহতের ঘটনায়, রাজধানীর বনানীতে সড়ক অবরোধ করে রাখেন সহকর্মীরা। তারা সড়কের দুই পাশ বন্ধ করে দেয়, যাতে প্রায় সাত ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে। বনানীর অবরোধের প্রভাবে অন্য সড়কেও তীব্র যানজট, চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। আর যানজটে নাকাল হন অফিসগামীসহ বিভিন্ন কাজে বের হওয়া মানুষ।
সোমবার ভোর ৬টা ৪১ মিনিটে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক নারী পোশাকশ্রমিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। এর জেরে সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বনানী ও মহাখালী অংশ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। তারা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানীতে নামার র্যাম্পও বন্ধ করে রাখেন। ফলে বনানীগামী যানবাহনগুলো এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামতে পারেনি। ট্রাফিক গুলশান বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, বনানী-কাকলী ক্রসিং এবং মহাখালীর আমতলীতে ডাইভারশন দিয়ে গুলশান-২ থেকে গুলশান-১ হয়ে আমতলী দিয়ে ইনকামিং এবং ভাইস ভার্সা হয়ে আউটগোয়িংয়ে চলাচল করা যাচ্ছে।
এদিকে অবরোধের কারণে, বানানী-মহাখালীর পাশাপাশি যানজট ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়কগুলোতেও। বিশেষ করে ইসিবি চত্বর, মাটিকাটা, শ্যাওড়া, খিলক্ষেত, বিমানবন্দরসহ আশপাশের প্রতিটি সড়কে যানবাহনের তীব্র চাপ দেখা যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। সরেজমিনে বনানী, গুলশান, ফার্মগেট, তেজগাঁও, শাহবাগ, কারওয়ানবাজার, মহাখালী, বাড্ডা, রামপুরা, হাতিরঝিল পাশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। আর এই যানজটের প্রভাব পড়ে রাজধানীজুড়েই।
সাড়ে ১১টার দিকে ইসিবি চত্বর, মাটিকাটা থেকে ফ্লাইওভার হয়ে র্যাডিসন ব্লু হোটেল পর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, পুরো সড়কেই গাড়ির তীব্র চাপ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যেসব গাড়ি অবরোধের কারণে সামনে যেতে পারছে না সেগুলো ফ্লাইওভার দিয়ে মিরপুরের দিকে প্রবেশের চেষ্টা করে। অনেকে আবার বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করেন। আর ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখ, উপরে এবং শেষপ্রান্ত পর্যন্ত উভয় পাশের সড়কেই গাড়ি থেমে থাকে। আর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বনানী থেকে বিমানবন্দর ছাড়িয়ে উত্তরার জসিমউদদীন পর্যন্ত যান চলাচল এক প্রকার স্থবির হয়ে থাকে। এ অবস্থায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন রোজা রেখে বাইরে বের হওয়া মানুষ।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী নূর ইসলাম বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে রামপুরা পর্যন্ত সহজেই চলে আসতে পেরেছি। তবে এরপর আর কোনোভাবেই গুলশানের অফিসে যেতে পারছি না। পরে বাস থেকে নেমে হাতিরঝিল দিয়ে হেঁটে অফিসে যাচ্ছি। দীর্ঘসময় বাসে বসে থাকার পর অনেককে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা করতে দেখা গেছে।
নুরুল ইসলাম নামে এক পথচারী বলেন, দীর্ঘসময় ধরে এক জায়গায় বসে আছি। মহাখালী যাওয়ার উদ্দেশে বের হয়েছিলাম। কিন্তু গাড়ি জায়গা থেকে নড়ছে না। এখন পেছনে ফিরে যাব সে সুযোগও নেই। বাধ্য হয়ে হেঁটে যাচ্ছি। দেখি কোন পর্যন্ত গিয়ে গাড়িতে উঠতে পারি।
গ্রিন রোড এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফররুখ আহমেদ বলেন, তিনি বিমানবন্দর থেকে দু-আড়াই ঘণ্টা হেঁটে মহাখালী পর্যন্ত এসেছেন। কুমিল্লার বাসিন্দা কামরুল হাসান সৌদি আরব যাবেন। তার ফ্লাইট বেলা ২টা ২৫ মিনিটে। যানবাহন না পেয়ে তিনি হেঁটে বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন। কামরুল হাসান বলেন, কুমিল্লা থেকে গাড়িতে তেজগাঁও পর্যন্ত এসেছেন। রাস্তা বন্ধ শুনে হেঁটে রওনা দেন তিনি।
এনা পরিবহনের বাসচালক হাফিজুর রহমান বলেন, সিলেট থেকে সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে বনানীতে পৌঁছান তিনি। এরপর বাসটি আটকে দেন শ্রমিকরা। তখন থেকে একই জায়গায় আটকে ছিলেন তিনি। এ কারণে বাস থেকে সব যাত্রী নেমে গেছেন। স্কুলবাসের চালক শহিদুল ইসলাম দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বলেন, গুলশান থেকে তিনি উত্তরা যাচ্ছিলেন। সকাল ৭টা ২২ মিনিটের দিকে গাড়িসহ আটকে পড়েন তিনি।
প্রায় ৭ ঘণ্টা অবরোধের পর সড়ক থেকে সরে যান বিক্ষুব্ধরা। এরপর যান চলাচল শুরু হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তারেক মাহমুদ বলেন, শ্রমিকরা তিনটি দাবি জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে আছে পিকআপ ও চালককে আটক, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও নিরাপদে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা। পিকআপটি ইতিমধ্যে জব্দ হয়েছে। চালককে আটকের চেষ্টা চলছে। আর ক্ষতিপূরণ ও নিরাপদে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা আলোচনা করবেন।
অন্যদিকে, শ্রমিককে চাপা দেওয়া গাড়িটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গতকাল বিকেলে সংস্থাটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। এতে বলা হয়, ঢাকা মেট্রো-ন-১৪-০৭৬২ নম্বর গাড়িটি আজ ঢাকার বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় সকাল ৬টার দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে একজন নারী পোশাকশ্রমিক নিহত ও একজন আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। এ অবস্থায় সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৪৬ অনুযায়ী ঢাকা মেট্রো-ন-১৪-০৭৬২ নম্বর গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িক স্থগিত করা হলো।
গাড়িটির মালিকের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, আপনাকে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সনদ, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় ঢাকা মেট্রো-ন-১৪-০৭৬২ নম্বর গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন স্থায়ী বাতিল করাসহ আপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশ প্রতিবেদক 









