কেউ গভীর ঘুমে কেউবা সাহরির জন্য উঠেছেন; কারও মুখে ছিল সাহরির খাবার। এমন অবস্থায় মঙ্গলবার ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজাবাসীর ওপর হামলে পড়ে দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল। চলে উপর্যুপরি বিমান হামলা। ভয়াবহ এই হামলায় একদিনেই চার শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। হতাহতের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। বর্বর এই হামলার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শও করেছিল ইসরায়েল; খোদ হোয়াইট হাউস বিষয়টি জানিয়েছে। এ হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলকে বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে উল্লেখ করেছে স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে এ প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়, যাতে হামাস নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ভাষ্য ইসরায়েলের। যদিও নিহতদের বেশির ভাগই নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
ইসরায়েলি দৈনিক মারিভ জানিয়েছে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাক্ষ্য স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার ওই সাক্ষ্য নেওয়ার কথা থাকলেও উদ্ভূত ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’তে তা স্থগিতের অনুরোধ জানান নেতানিয়াহু। পরে তা আমলে নিয়ে সাক্ষ্য স্থগিত করে আদালত।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও হামাসের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মাহমুদ আবু ওয়াফাহ ওই হামলায় নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে বড় হামলা। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনায় এক সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থার পর ইসরায়েল ফের হামলা শুরু করল।
রয়টার্স লিখেছে, গাজার উত্তরাঞ্চল, গাজা সিটি এবং মধ্য ও দক্ষিণ গাজার দেইর আল-বালাহ, খান ইউনিস ও রাফাহসহ একাধিক স্থানে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রোজার মাস হওয়ার কারণে অনেকেই যখন সাহরির খাবার খাচ্ছিলেন, তখন গাজায় বিস্ফোরণ শুরু হয়। ওই সময় অন্তত ২০টি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে তারা উড়তে দেখেছেন।
হামলার পর গাজার বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। কেউ কেউ হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ওই হামলার নির্দেশ দেন। তারা বলেছে, ‘আমাদের জিম্মিদের মুক্তি দিতে হামাসের বারবার অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত স্টিভ উইটকফ এবং মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে পাওয়া সব প্রস্তাব হামাসের প্রত্যাখ্যানের পর এ হামলা চালানো হয়।’
বিবৃতিতে বলা হয়, এখন থেকে ইসরায়েল সামরিক শক্তি বাড়িয়ে হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। সপ্তাহান্তে হামলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী, যাতে সায় দেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, যতক্ষণ না সব লক্ষ্য অর্জিত হয় এবং জিম্মিরা ফিরে আসে, ততক্ষণ ইসরায়েল আরও ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙার জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ঘাতকতার অভিযোগ এনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হামাস। তবে হামাস এখনো ফের যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেয়নি। তার বদলে মধ্যস্থতাকারীদের এবং জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে।
হামাসের কর্মকর্তা ইজ্জত আল-রিশেক জানিয়েছেন, গাজায় পুনরায় যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে ইসরায়েল তার বন্দিদের বলিদান দিচ্ছে এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ফক্স নিউজকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, ‘গাজায় সবশেষ আক্রমণ শুরু করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল ইসরায়েল।’
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাস, হুথি, ইরানÑ যারা কেবল ইসরায়েলকে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রকে আতঙ্কিত করতে চায়। তাদের মূল্য দিতে হবে এবং তাদের ওপর সমগ্র নরক ভেঙে পড়বে।’
ক্যারোলিন লিভিট আরও বলেন, ‘হুথি, হিজবুল্লাহ, হামাস, ইরান ও ইরান-সমর্থিত প্রতিনিধিদের উচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া। কারণ ট্রাম্প বলছেন, তিনি আইন মেনে চলা মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের বন্ধু ও মিত্র ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়াতে ভয় পান না।’
বিবিসি লিখেছে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্ব ১ মার্চ শেষ হওয়ার পর সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছিলেন মধ্যস্থতাকারীরা।
যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্বের মেয়াদ মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যার মধ্যে আরও জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের শর্ত ছিল।
তবে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, পরোক্ষ আলোচনায় উইটকফের চুক্তির মূল দিকগুলো নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং তিন মধ্যস্থতাকারী দেশÑ যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের ব্যাপক প্রচেষ্টায় গত জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বা¶র করে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন সরকার ও গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাস। চুক্তির শর্ত অনুসারে, ১৯ জানুয়ারি থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হয় গাজায়।
চুক্তির কাঠামো ও বাস্তবায়ন: যে চুক্তির ভিত্তিতে ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল, সেটি তিনটি পর্বে বিভক্ত ছিল: ১. হামাসের কব্জায় থাকা জিম্মি ও ইসরায়েলের কারাগারে থাকা বন্দিদের বিনিময়ের পাশাপাশি গাজায় খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ স্বাভাবিক করার শর্ত ছিল। ২. অবশিষ্ট সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস এবং গাজা থেকে ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করবে। ৩. দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।
প্রথম ধাপের মেয়াদ ছিল ছয় সপ্তাহ, যা সম্প্রতি শেষ হয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্বের বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। হামাস গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চাইছিল, অন্যদিকে ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, সেনা প্রত্যাহার করলে হামাস আবার সংগঠিত হয়ে ভবিষ্যতে ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারে।
ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারে মতবিরোধ : হামাস দাবি করেছিল, ইসরায়েলকে গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। তবে ইসরায়েল মনে করছিল, এটি করলে হামাস পুনরায় সংগঠিত হয়ে ইসরায়েলে নতুন করে হামলা চালাতে পারে।
বন্দিবিনিময় ও জিম্মিদের পরিস্থিতি : সম্প্রতি হামাস যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্বৈত নাগরিক এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সেনা সদস্য ইদান আলেজান্ডারসহ চারজন দ্বৈত নাগরিকের মরদেহ ফেরত দেয় ইসরায়েলকে। ইসরায়েল দাবি করে, হামাস ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের হত্যা করেছে। তবে হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা : বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ বাড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী ধাপগুলো বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী ছিল না। এছাড়া, হামাস যে নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় প্রত্যাখ্যান করে।
মানবিক সহায়তা বন্ধ করা : হামাসকে চাপে ফেলতে ২ মার্চ থেকে গাজায় খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা এখনো পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও যুদ্ধবিরতির ভেস্তে যাওয়ার একটি বড় কারণ। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং ডানপন্থি জোটকে ধরে রাখতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তিনি জনগণের চাওয়া উপেক্ষা করে চুক্তি বাস্তবায়ন না করার নীতি অনুসরণ করছেন।
এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চলমান হামলা ও অবরোধের কারণে খাদ্য, পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, তাহলে গাজায় আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। নিরীহ ফিলিস্তিনিরা জীবন হারাচ্ছে, যারা বেঁচে আছেন তারা ভয়ংকর মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছেন। যুদ্ধবিরতির ব্যর্থতা গাজাকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর সবশেষ গাজা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ওই হামলায় ১২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক। ওই সময় ২৫১ জনকে জিম্মিও করে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠনটি।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘসহ অন্যদের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার পাল্টায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় ১৫ মাসে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক।
গাজার ২১ লাখ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ৭০ শতাংশেরও বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে; সংকট দেখা দিয়েছে খাবার, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয় পাওয়া নিয়ে।
দেশ ডেস্ক 









