দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আট দেশে শুক্রবার আঘাত হানে শক্তিশালী ভূমিকম্প। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমার। দেশটিতে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। মিয়ানমার ছাড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০ জনের।
দেশ দুটিতে হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, বিশেষত মিয়ানমার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার জানা যায়নি। কেননা মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে ও সেখান থেকে তথ্য পাওয়া আগে থেকেই কঠিন।
তবে এবারের ভূমিকম্পে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর বাইরে যে পরিমাণ আর্থিক, পরিবেশগত এবং সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আর্থিক মূল্যে তার পরিমাণ ছাড়াতে পারে এক হাজার কোটি ডলার বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বার্মিজ জান্তা সরকারের প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেন, ‘হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।’ এ দিকে দেশটির সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছেÑ ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০০২। আহত হয়েছেন দুই হাজার ৩৭৬ জন। এর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে দেশটিতে অন্তত ১১৪ জন নিহত ও ৭৩০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিলেন জান্তাপ্রধান।
মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে দেশটিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭৩২ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে রাজধানী নেইপিদোয়ে ৯৬ জন, সাগাইংয়ে ১৮ জন ও মান্দালয়ে ৩০ জন রয়েছেন। তবে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
এ দিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ৩০ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৫ জনের জীবনের চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের জীবিত উদ্ধারে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ব্যাংকক দমকল ও উদ্ধার বিভাগের পরিচালক সুরিয়ান রাভিওয়ান জানান, এই দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
সুরিয়ান জানান, ৩০তলা নির্মাণাধীন ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৫ জনের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উদ্ধারের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ও পানিশূন্যতার কারণে ভুক্তভোগীরা শকে চলে যেতে পারেন। তবে আমরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার অভিযান শেষ করার চেষ্টা করছি।
যদিও এখন পর্যন্ত আটকে পড়া লোকদের কাছে পানি বা খাদ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কারণ তারা ধ্বংসস্তূপের প্রায় তিন মিটার গভীরে রয়েছেন।
এ দিকে ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধারকাজ সহজ করতে ক্রেন ট্রাক ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের কংক্রিটের অংশগুলো সরানো হচ্ছে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকক মহানগর প্রশাসন ১৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রকৌশলী মোতায়েন করেছে।
অন্য দিকে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, এরই মধ্যে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছেছে দেশটির ৩৭ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল। আর রাশিয়া ১২০ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল মিয়ামারে পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে রুশ সরকারি সংবাদমাধ্যম তাস।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণসহায়তা হিসেবে ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে জাতিসংঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তার দেশ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি যেভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কাটছাঁট করেছে তাতে তার এ আশ্বাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
মিয়ানমারের ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা।
ভূমিকম্পের পর নেপিডো, মান্দালয়, সাইগাইংসহ ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী- শক্তিশালী কম্পনে নেপিডো, সাইগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে অনেক ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতী নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে।
ভূমিকম্পে মিয়ানমারের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
মিয়ানমারের মান্দালয়ে বেশকিছু ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে শহরের সবচেয়ে বড় মঠও রয়েছে। কিছু ছবিতে রাজধানী নেপিডোর ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে নিয়ে আসতে দেখা যায়।
জান্তা সরকার বলছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় আহত ব্যক্তিদের জন্য রক্তের বিশেষ প্রয়োজন। মিন অং হ্লাইং বলেছেন, মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
কয়েকটি চীনা মিডিয়ার দাবি, চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে এবং মিয়ানমার সীমান্তের রুইলি শহরে ক্ষয়ক্ষতি ও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পেপার’কে একজন বাসিন্দা জানান, রুইলি থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে মাং শি শহরে এত জোর কম্পন অনুভূত হয় যে লোকজন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, গত শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। যার কেন্দ্র ছিল- মিয়ানমারের দ্বিতীয় বড় শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার একটি পরাঘাত (আফটার শক) হয়।
বিশ্বে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর একটি মিয়ানমার। দেশটিতে বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পে জনবহুল এলাকাগুলো কেঁপে উঠলেও গতকাল শহরগুলো যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, তা আগে দেখা যায়নি। ইউএসজিএসের অনুমান, দেশটিতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মিয়ানমারের শোচনীয় এক সময়ে এই ভূমিকম্প হলো বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক জো ফ্রিম্যান। তিনি বলেন, দেশটিতে চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে আগে থেকেই ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ভূমিকম্পের কারণে সেই সংকট আরও তীব্র হলো।
ব্রেকিং নিউজ
ক্রেন-ট্রাক দিয়ে চলছে ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ
হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি, ১০ হাজার মৃত্যুর শঙ্কা
-
দেশ ডেস্ক - প্রকাশ : ০১:৩০:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫
- ৬২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয়










