দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা প্রক্সি সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে, ইতিহাসের এক নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরান ও ইসরায়েল, এই অঞ্চলের দুই প্রধান সামরিক শক্তি, এখন সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা চালাচ্ছে। দুই দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর এলেও, হতাহতের পরিসংখ্যান এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ইরানের হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছে এবং অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।
রোববার টানা তৃতীয় দিনের মতো পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলায় পুরো অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। এই নজিরবিহীন সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।
গত ১৩ জুন থেকে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের তৃতীয় দফা শুরু। ইসরায়েলের প্রথম ধাপে, ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে পরিচিত অভিযানে তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে বোমা ও ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় ইরানের সেনাপ্রধানসহ অন্তত ২০ জন সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এতে ওই দিন ১৫ জন আহত হয় এবং সাধারণ নাগরিক নিহত হয়।
তেল আবিবের বুকে গাজার প্রতিচ্ছবি : গেল শুক্রবার ইরানে ইসরায়েলি হামলার জবাবে তেহরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রি’ নামে যে ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তা ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবের চেহারা বদলে দিয়েছে। ইরানের ছোড়া মুহুর্মুহু ব্যালিস্টিক, ক্রুজ ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক সময়ের সাজানো-গোছানো শহরটি যেন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অনেক বাড়িঘর, বাণিজ্যিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
হামলার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র যে, অনেক ইসরায়েলি নাগরিকের কাছে এই দৃশ্য গত দেড় বছর ধরে চলা তাণ্ডবে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। পাখির চোখে ধারণ করা তেল আবিবের ধ্বংসযজ্ঞের ছবিগুলোতে গাজারই প্রতিচ্ছবি দেখছে বিশ্ব।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২০০ জনের বেশি ইসরায়েলি নিহত অথবা আহত হতে পারে বলে তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে শনিবার রাত এবং রোববার ভোরে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এ ঘটনা ঘটতে পারে। তেল আবিবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বাত ইয়াম এবং রেহবতকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এদিকে ইরানের হামলায় আহত ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইসরায়েলি মিডিয়াতে পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
কিছু সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় ৯ জন নিহত এবং ২০৭ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাত ইয়ামে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিখোঁজ রয়েছে।
ইসরায়েলের সংবাদ মাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় আহতের সংখ্যা ২৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। এছাড়া এ হামলায় তেল আবিবে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।
ইসরায়েল পরিচালিত রেডিওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাত ইয়াম শহরে ইরানের হামলায় ডজন খানেক ঘরবাড়ি এবং ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে দেশটির বাসিন্দাদের বর্ণনায় ফুটে উঠছে চরম আতঙ্ক ও বিস্ময়ের চিত্র। এক বাসিন্দা বলেন, ‘সাইরেনের আওয়াজ শুনেই আমরা শেল্টারের দিকে দৌড় দিই। আমরা সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই বিকট বোমার শব্দ শুনতে পাই। বেসামরিক এলাকায় রকেট এসে পড়েছে, বহু স্থাপনা ধসে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকেই চাপা পড়েছিল।’
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবতেও পারিনি যে আমাদের এমন ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হবে। এই মুহূর্তগুলো দুঃস্বপ্নের মতো।’ শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, হামলায় রেহোভোট শহরের বিখ্যাত গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় ‘উইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স’-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর এলেও, প্রতিবেদনে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ ও সরকারি পরিসংখ্যান এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ইরানের হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছে এবং অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে। তবে তেহরানে রাতভর ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, তিন দিনে ইরানের ৭২০টির মতো সামরিক স্থাপনা ধ্বংস বলে জানায় ইসরায়েল।
এদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দুজনকে আটক করেছে ইরানের গোয়েন্দা বিভাগ। ইরানের আলবোর্জ প্রদেশ থেকে তাদের আটক করা হয়েছে বলে জানায় দেশটির বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদনে। আটকের মুহূর্তে বিস্ফোরক তৈরি করছিল ওই দুই ব্যক্তি। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এর আগে ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আরও ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। দেশটির ইয়াজদ শহর থেকে আটক করা হয় তাদের।
ইসরায়েলের অজেয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ফাটল : ইরানের এই সমন্বিত আক্রমণে ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে ‘আয়রন ডোম’, কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গবেষক মুহাম্মদ সেলুমের মতে, আয়রন ডোম মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট ও সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য তৈরি। কিন্তু ইরান এবার ব্যবহার করেছে অত্যাধুনিক ক্রুজ, ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক মিসাইল, যা ঠেকানো আয়রন ডোমের ক্ষমতার বাইরে।
যদিও ইসরায়েলের কাছে ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’-এর মতো আরও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা বায়ুমণ্ডলের অনেক উপরে গিয়েও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম, কিন্তু ইরানের ব্যাপক ও সমন্বিত হামলা সেই ব্যবস্থাকেও প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে।
ইসরায়েলের পাল্টা আঘাত ও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ভবিষ্যৎ : ইরানের হামলার জবাবে ইসরায়েলও বসে থাকেনি। শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত স্থানগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। বিবিসি কর্তৃক যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, নাতাঞ্জ, ইসফাহানসহ অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে হামলা চালানো হয়েছে।
নাতাঞ্জ হলো ইরানের সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং ইসফাহান পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্রে ইউরেনিয়ামকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তাদের হামলায় এই কেন্দ্রগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। এই হামলা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে এবং পারমাণবিক শক্তিকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ থেকে সম্মুখ সমরে : ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সংঘাত আকস্মিক নয়। গত সাত বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে একটি গোপন যুদ্ধ চলছিল, যা মূলত সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের মতো তৃতীয় দেশে এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৯-২০২১ সালে ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানের মিত্রদের ওপর এবং লোহিত সাগরে ইরানের তেল ও অস্ত্রবাহী জাহাজে ধারাবাহিক হামলা চালায়। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে দূর-নিয়ন্ত্রিত মেশিনগানের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ২০২২ সালে তেহরানে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) এক কর্নেলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইরান এর জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে। ২০২৪ সালে এপ্রিলে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হন। এই ঘটনাটিই বর্তমান সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে, যার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। আর সেই সূত্র ধরেই চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ : এই সংঘাতে বৈশ্বিক শক্তিগুলোও বিভক্ত। চীন স্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলাকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরানকে পারমাণবিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার অনুরোধ করেছেন। এছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইসলামি দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা উচিত এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য ও সমন্বয় থাকলে ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা সম্ভব। সাধারণ নাগরিক, বিজ্ঞানী, সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মীদের হত্যা করে ইসরায়েল আবারও প্রমাণ করেছে যে, তারা মানবাধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক আইনকে কোনো মূল্য দেয় না। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে ইরানের জনগণ ও সরকারের প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানান পেজেশকিয়ান।
এদিকে এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না।
বর্তমানে পুরো বিশ্ব গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এই সংঘাত যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার পরিণতি হবে অকল্পনীয়।
দেশ ডেস্ক 









