ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন নতুন মোড় নিয়েছে। গত ১৩ জুন থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা গত শনিবার মধ্যরাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ হামলায় নতুন রূপ পেয়েছে। ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন ই-২ স্টেলথ বোমারুর আঘাতে মধ্যপ্রাচ্য এখন যেন আগুনের গোলায়।
এদিকে মার্কিন এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ল, যা পুরো অঞ্চলকে এক অনিয়ন্ত্রিত ও সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে; রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, আর জাতিসংঘ একে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
শনিবার রাতে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইস্পাহানে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হামলার পরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দম্ভের সঙ্গে ঘোষণা দেন, ‘আমরা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় খুবই সফলভাবে হামলা সম্পন্ন করেছি।’ তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি দ্রুত শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতের হামলা আরও বড় এবং মারাত্মক হবে।
তবে ইরান এই হামলাকে একটি ‘ব্যর্থ প্রচেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দাবি করা হয়েছে, হামলার আগেই কেন্দ্রগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক উপকরণ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, শত্রুরা যদি মনে করে তারা আমাদের পরাজিত করতে পারবে, তবে তারা মারাত্মক ভুল করছে। যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব আর একবার লঙ্ঘনের চেষ্টা করা হয়, তবে এর জবাব হবে এমন যে, শত্রুরা ইতিহাসে এ ক্ষণের জন্য অনুতপ্ত হবে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরান-ইসরায়েল সংঘাতও থেমে নেই। ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের অন্তত ১০টি স্থানে ১১ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ইরানও মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মাজিদ মোসায়েবি নামের এক ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া : নিন্দা উদ্বেগ ও সমর্থন:-
মার্কিন এই আগ্রাসনে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা বিশ্ববাসীর জন্য ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে ইরানে মার্কিন বিমান হামলার নিন্দা জানিয়েছে চীন। ওয়াশিংটন অতীতের কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিজিটিএনের একটি ফ্ল্যাশ মন্তব্যে মার্কিন পদক্ষেপকে ‘একটি বিপজ্জনক মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে ওই মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায়শই অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনে, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা।’
রাশিয়া ও মিত্রদের তীব্র নিন্দা:-
রাশিয়া এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং একটি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছে। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘নেতানিয়াহু একদিন বিদায় নেবেন, কিন্তু ইরান একটি প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।’ তিনি ইসরায়েলের নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈত নীতির সমালোচনা করেন।
মধ্যস্থতাকারী ও প্রতিবেশীদের উদ্বেগ:-
ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান এই হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই উত্তেজনা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে।
পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন:-
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ‘ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তার হুমকি দূর করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিয়েছে।’ অস্ট্রেলিয়াও একই সুরে কথা বলেছে।
পারমাণবিক সংকট ও কূটনৈতিক তৎপরতা:-
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ পায়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সংস্থাটি সোমবার এক জরুরি বৈঠকে বসবে। ইরান এই হামলার ঘটনায় আইএইএ-কে আনুষ্ঠানিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং সংস্থাটির প্রধান রাফায়েল গ্রোসির নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দিকটি হলো ইরানের রাশিয়া-মুখিতা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববারই রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। সোমবার মস্কোয় তিনি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়’ বসবেন। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আগে থেকেই কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে। মার্কিন আগ্রাসনের মুখে এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কোন পথে?:-
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান এই হামলাকে কেবল একটি সামরিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় আত্মমর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে। সর্বোচ্চ নেতা খামেনির হুঁশিয়ারি এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বৈঠক প্রমাণ করে, তেহরান এর সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই জবাব হতে পারে সরাসরি মার্কিন স্বার্থে আঘাত, অথবা তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো।
অন্যদিকে, ট্রাম্প তার আগ্রাসী নীতির মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করতে চাইছেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। ইরান এখন আরও কঠোর অবস্থান নেবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে।
বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর:-
ইরানের প্রতিশ্রুত প্রতিশোধের রূপ কী হবে, মস্কোয় পুতিন ও আরাগচির বৈঠক থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং আইএইএ-র জরুরি বৈঠক এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে শান্ত করতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না। একটি বিষয় স্পষ্ট-মধ্যপ্রাচ্যের দাবানল এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে, যার একটি স্ফুলিঙ্গই বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
দেশ ডেস্ক 









