মধ্যপ্রাচ্য আবারও উত্তপ্ত। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং পরাশক্তিদের জড়িয়ে পড়া সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। এই জটিল সময়ে ইরান যেভাবে তার সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান জোরদার করছে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরমাণু কার্যক্রম থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং সামরিক জোট সব ক্ষেত্রেই ইরানের সক্রিয়তা স্পষ্টতই বাড়ছে। অন্যদিকে ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাতের প্রভাবে তেলের দাম আকাশচুম্বী এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে, একের পর এক হামলা ও পাল্টাহামলায় পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের ঘনঘটা। তেহরান তার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি, পারমাণবিক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থেকে সরে এসে নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান কেবল প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে না, বরং এই সংঘাতের মাধ্যমে একটি নতুন সামরিক সমীকরণের জানান দিচ্ছে, যেখানে তারা নিজেদের একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
এদিকে উত্তেজনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি স্থগিত করার ইরানের সিদ্ধান্ত। দেশটির পার্লামেন্ট, মজলিশ, ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি বিল তৈরির কাজ শুরু করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, আইএইএ-এর সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন ইসরায়েলকে ইরানে হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারির বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বরাবরই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে। এখন এই সিদ্ধান্তের ফলে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠিক কোন পর্যায়ে আছে, তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়বে। এটি ইসরায়েলকে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে উসকানি দিতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নতুন রণকৌশল:-
ঐতিহ্যগতভাবে ছায়াযুদ্ধ ও প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে সংঘাতে লিপ্ত থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান তার কৌশল পরিবর্তন করে সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের সাবেক বিচারমন্ত্রী ইয়োসি বেইলিনের মতে, দিনের আলোয় ইরানের চালানো সাম্প্রতিক হামলাটি ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বিরল ঘটনা। সাধারণত রাতের অন্ধকারে সামরিক অভিযান চালানো হলেও, দিনের আলোয় এই হামলা ইরানের পরিবর্তিত এবং সাহসী সামরিক কৌশলের পরিচায়ক।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একযোগে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে বেশ কয়েকটি শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এই হামলা এতটাই তীব্র ছিল যে, অনেক ইসরায়েলি এমপি এবং সাধারণ নাগরিককে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়, যা দেশটিতে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করে। ইরান এই হামলার মাধ্যমে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সক্ষমতা এবং ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায়, ইসরায়েলও পিছিয়ে থাকেনি। তেহরানের নিকটবর্তী পাচিন মিলিটারি কমপ্লেক্সসহ ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কিছু সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। তবে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা ইসরায়েলের একটি অত্যাধুনিক ‘হার্মেস-৯০০’ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:-
এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে। রাশিয়া দৃঢ়ভাবে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘অযৌক্তিক আগ্রাসন’ এবং ‘বিনা উসকানিতে হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন। মস্কোতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, এই হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং রাশিয়া ইরানের জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। রাশিয়ার এই প্রকাশ্য সমর্থন ইরানকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র একটি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মন্তব্য করেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না’, বরং তাদের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রতিহত করা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালেও, তারা এটিকে একটি সীমিত পরিসরের অভিযান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। মার্কিন সেনাপ্রধান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানা হলে ইরানকে তার কঠিন জবাব দেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণ স্কেলে যুদ্ধে জড়াতে চায় না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান-সমর্থিত বাহিনীগুলোর হামলার প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, সংঘাত আরও বাড়লে মার্কিন স্বার্থও নিরাপদ থাকবে না।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতা:-
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর অর্থনৈতিক পরিণতিও বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে ইরান ও তার সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাকি মিলিশিয়ারা রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই পক্ষের সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার অর্থ হলো পুরো অঞ্চলের জন্য এক বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হওয়া।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের পথে ইরান:-
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে রয়েছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের ভোটে এরই মধ্যে এই প্রণালি বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। এখন কেবল এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নওয়ার পালা ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের।
এরই মধ্যে ইরান সম্প্রতি এ প্রণালিতে ব্যাপক মাত্রায় জিপিএস জ্যামিং শুরু করেছে, যার ফলে প্রায় ৯৭০টি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ পথ হারিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক শিপিং নজরদারি সংস্থাগুলোর বরাতে জানা গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই তোড়জোড়ের মধ্যেই দেশটিকে এই পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে চীনকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রোববার ফক্স নিউজে এক প্রোগ্রামে তিনি বলেন, আমি চীন সরকারকে উৎসাহিত করব যাতে তারা ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কারণ, তারা তেলের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
ইরান এটা (হরমুজ প্রণালি বন্ধ) করলে তা হবে আরেক মস্ত ভুল। এটি হবে তাদের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহননের শামিল। আমাদের ওই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিকল্প পথ হাতে আছে। তবে অন্য দেশগুলোও সেসব বিকল্প পথের সন্ধান করবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আমাদের চেয়ে অন্য দেশগুলোর অর্থনীতি অনেক বেশি খারাপ অবস্থায় পড়বে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন এই প্রণালি বন্ধের পদক্ষেপে উত্তেজনা অনেক বেশি বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য দেশগুলোও এর
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান তার সামরিক এবং কৌশলগত শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচিতে অস্বচ্ছতা, সরাসরি ইসরায়েলে হামলা চালানোর সাহস, অত্যাধুনিক ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা এবং রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তির সমর্থনÑএসবই ইরানকে একটি নতুন এবং প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। তেহরান এখন আর শুধু প্রতিরোধমূলক অবস্থানে নেই, বরং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতেও তারা প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। ইরান যেভাবে তার শক্তি প্রদর্শন করছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে সংঘাতের তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং তা এক নতুন এবং আরও বিপজ্জনক দিকে মোড় নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
দেশ ডেস্ক 









