প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর পরিবর্তন হয়েছে। এখন ডেঙ্গু শুধু মৌসুমি রোগ নয়, বছরব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। বর্তমানে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে।
চলতি বছর, মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুর যে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার দেখা যাচ্ছে, তা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক অশনি সংকেত মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষন করে তারা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গুআক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
সোমবার (৭ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুআক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ৪৯২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮ জন।
চলতি বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১২ হাজার ৭৬৩ জনে। এদের মধ্যে পুরুষ ৭,৫৫৮ এবং নারী ৫,২০৫ জন। আক্রান্তদের বড় অংশই রাজধানী ঢাকার বাইরের, যা ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকার বাইরেও তীব্রতায় বাড়ছে শঙ্কা। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৯২ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ১৫৪ জন। এরপর রয়েছে রাজশাহী (৬১ জন), খুলনা (৫৪ জন), চট্টগ্রাম (৫১ জন), ঢাকা বিভাগের বাইরের অংশ (৬৯ জন), ডিএনসিসি (৩৬ জন), ডিএসসিসি (৫৩ জন), ময়মনসিংহ (১০ জন), রংপুর (৩ জন) ও সিলেট বিভাগে (১ জন)। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি দেশব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে।
২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা ছিল রেকর্ড। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু ৫৭৫ জনে দাঁড়ায়। চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই ১ হাজার ৬৫৮ জন আক্রান্ত এবং ৩ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত জুন মাসের তুলনায় (৫ হাজার ৯৫১ আক্রান্ত) উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ডেঙ্গুর মৌসুমি তীব্রতার ইঙ্গিত দেয়।
সম্ভাব্য ঝুঁকি:-
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃষ্টি জলাবদ্ধতা এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। জলাবদ্ধতার কারণে পানি জমে থাকা এডিস মশার লার্ভার বংশবিস্তারকে ত্বরান্বিত করে, ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নগরী এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু ছড়ানোর সম্ভাবনা উদ্বেগজনক।
ভাইরাস থেকে মহামারি:-
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছেÑ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। একই ব্যক্তি একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং দ্বিতীয়বার সংক্রমণ আরও মারাত্মক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশগত পরিবর্তন, বৃষ্টির পানি জমে থাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি এবং জলাবদ্ধতা এ রোগ বিস্তারের জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও মশাবাহিত রোগগুলো বেড়েছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা:-
ডেঙ্গু পরিস্থিতি যেন বারবারই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যে কতটা দুর্বল, তার প্রমাণ মিলছে প্রতিটি মৌসুমেই। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সময়মতো মশা নিধন কর্মসূচি না নেওয়া, গণসচেতনতায় ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সামনে ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। বর্ষার পুরো সময়জুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে থাকে। জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসগুলোতে সাধারণত রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান বলেন, আমরা প্রতি বছর একই ভুল করছি। মশার প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ার আগে কার্যকর অভিযান চালাই না। যখন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন লোক দেখানো কিছু অভিযান হয়, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হয় না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ এখনো মনে করে ডেঙ্গু শুধু গরিবদের রোগ। অথচ এটা সবার জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুল, অফিস, বাসাÑ সব জায়গায় সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর শত্রু আমরা সবাই চিনিÑ এডিস মশা। এটি এক সময় শহরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। বরং শহরের বাইরেই এখন বেশি। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে মশা বাড়ছে। জমা পানিতে মশা ডিম পাড়ে এবং বংশবৃদ্ধি করে। এই মশা আপনার-আমার ঘরে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ এটি গৃহস্থালি মশা, ঘরেই বেশি থাকে। সুতরাং ফ্রিজের নিচে, এসির নিচে, ফুলের টব, ছাদ ও বাসার চারপাশে যেখানে পানি জমে সেখানে মশা ডিম পাড়ে ও বংশবৃদ্ধি করে। পানি যেন কোথাও দুদিনের বেশি জমে না থাকে।
তিনি বলেন, আমাদের মূল কাজ হলোÑ মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এটি প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। যার যার ঘরবাড়ি, নিজেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ঘরের বাইরেও মশা মারার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাস্তার ধারে, পরিত্যক্ত টায়ার, চিপসের প্যাকেটসহ নানান জায়গায় পানি জমে থাকেÑ এসব সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া, জনগণকে খেয়াল রাখতে হবে, মশার কামড় থেকে নিজেকে যেন যতটা সম্ভব রক্ষা করা যায়। দিনে-রাতে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। ছোট বাচ্চারা যেন হাফপ্যান্ট না পরে, ফুল প্যান্ট পরাতে হবে। মশার কামড় থেকে রক্ষা পেলে আমরা নিজেকে, পরিবারকে, সমাজ ও দেশকে রক্ষা করতে পারবো।
হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি ও সংকট:-
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা হলেও ক্রমাগত রোগী বাড়তে থাকলে সংকট তৈরি হতে পারে। অনেক হাসপাতালেই রক্ত পরীক্ষা ও প্লাজমা সাপোর্টের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পেডিয়াট্রিক ডেঙ্গু, হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা শক সিনড্রোম আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত যত্ন প্রয়োজন, যা সবার পক্ষে প্রদান সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি এবং প্রতিদিনের আপডেটের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কেবল হাসপাতাল নির্ভরতা ডেঙ্গু মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের বলছেন, প্রতি বছর ডেঙ্গুর মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকে মৃত্যুবরণ করছে। এটি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা। এখন সময় হয়েছে বারবারের এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর এবং সমন্বিত একটি পরিকল্পনা গ্রহণের। কারণ, স্বাস্থ্য নিয়ে আপস চলে না।
আর মশা, বিশেষ করে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা, তা কখনোই সুযোগ হাতছাড়া করে না।
মাহমুদুল করিম খান 









