জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোপালগঞ্জ শহর। বুধবার সকাল থেকেই নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালিয়ে পুরো গোপালগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত করে। দিনভর চলা সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশসহ অর্ধশতাধিক।
নিহতদের মধ্যে তিন নাম জানা গেছে, তারা হলেন গোপালগঞ্জ শহরের উদয়ন রোডের বাসিন্দা সন্তোষ সাহার ছেলে দীপ্ত সাহা (২৫), কোটালীপাড়ার রমজান কাজী (১৮) ও টুঙ্গীপাড়ার সোহেল মোল্লা (৪১)।
বিষয়টি নিশ্চিত করে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, বিকেলে তিনজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁরা গুলিবিদ্ধ ছিলেন।
আরও ৯ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের অস্ত্রোপচার চলছে।
এর আগে ভাঙচুর করা হয় সমাবেশ মঞ্চ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ী। পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পুলিশ-সেনাবাহিনীর সঙ্গেও সংঘর্ষের জড়িয়ে পড়ে হামলাকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে রাত আটটা থেকে কারফিউ জারি করা হয়েছে। যা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে বলে সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে।
এদিন এনসিপির এই কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল থেকেই গোপালগঞ্জে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। দিনের প্রথমভাগে, সদর উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নের গান্দিয়াসুর এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম রকিবুল হাসানের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। ইউএনও রকিবুল হাসান জানান, এনসিপির পদযাত্রা বানচালের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সমর্থকরা তার গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এর পরপরই দুর্গাপুর ইউনিয়নে টহলরত পুলিশের একটি গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালের সমর্থকরা এ হামলায় জড়িত বলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির মো. সাজেদুর রহমান নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় পুলিশের তিনজন সদস্য আহত হন।
এদিন দুপুর দেড়টার দিকে, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সমাবেশস্থলে পৌঁছানোর আগেই, শহরের পৌরপার্ক এলাকায় আয়োজিত সমাবেশের মঞ্চে প্রথম দফা হামলা চালায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানধারী দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ২০০-৩০০ জনের একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে আকস্মিকভাবে মঞ্চে উঠে পড়ে। তারা মঞ্চের সাউন্ড বক্স, মাইক, চেয়ার ভাঙচুর করে এবং ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। উপস্থিত এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপরও চড়াও হয় হামলাকারীরা।
একই সময়ে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক হামলার মুখে মঞ্চের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও এনসিপি কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। তবে কিছু সময় পর জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা এবং এনসিপির নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এরপর সেই ভাঙা মঞ্চেই এনসিপি তাদের সমাবেশ শুরু করে।
‘মুজিববাদের কবর রচনার’ ঘোষণা
হামলার শিকার হয়েও এনসিপি নেতারা তাদের সমাবেশে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা গোপালগঞ্জের নাম বদলাতে আসি নাই। আমরা এসেছি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে গোপালগঞ্জের মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে। তিনি আরও বলেন, মুজিববাদীরা আজ বাধা দিয়েছে। গত জুলাই আন্দোলনে বলেছিলাম, বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই। সেই লড়াইয়ে আমরা জিতেছিলাম। আজ বাধা দেওয়া হয়েছে, দ্বিগুণ গতিতে আমরা জবাব দেব। গোপালগঞ্জকে মুজিববাদীদের হাত থেকে মুক্ত করেই ছাড়ব।
দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা আপনাদের ছেড়ে পালিয়েছে। তিনি গোপালগঞ্জকে ধারণ করলে ভারতে না গিয়ে এখানেই আসতেন। এ সময় হাসনাত সমাবেশ থেকে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান তোলেন এবং বলেন, এই গোপালগঞ্জে মুজিববাদীদের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা ঘোষণা করছি, ওই মুজিববাদের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।
একইভাবে, দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, গোপালগঞ্জে খুনি হাসিনার দালালেরা আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে…আমরা যদি এখান থেকে বেঁচে ফিরি তাহলে মুজিববাদের কবর রচনা করেই ফিরব, না হয় ফিরব না।
ফেরার পথে অতর্কিত হামলা ও রণক্ষেত্র
দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে সমাবেশ শেষ করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর যখন শহর ছেড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই লঞ্চঘাট ও চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা চারদিক থেকে সড়ক অবরোধ করে এনসিপি ও তাদের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ-সেনাবাহিনীর গাড়িবহরে ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হামলাকারীরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে তারা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গাড়িতেও ভাঙচুর চালায়। সংঘর্ষে অন্তত চারজন পুলিশ সদস্যসহ বহু মানুষ আহত হন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এনসিপি নেতাদের নিয়ে পিছু হটে গোপালগঞ্জ সার্কিট হাউসে এবং পরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়।
বিকেল নাগাদ শহরের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। হামলাকারীরা সমাবেশ মঞ্চ এবং বিভিন্ন তোরণে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনকি জেলা কারাগার থেকে আসামি বের করে নেওয়ার চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগও ওঠে। এই পরিস্থিতিতে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান পুরো জেলায় ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি চার প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়। সন্ধ্যার আগে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী এপিসি (আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) নিয়ে শহরে অভিযানে নামে এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে।
দেশ প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জ 









