ঢাকা ০৫:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা-সংর্ঘষ

গোপালগঞ্জে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, চার মামলায় আসামি ৩০০৮, গ্রেপ্তার ৩০৬

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা ঘিরে গোপালগঞ্জে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছে। এ নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মোট চারটি মামলা করা হলো।
এই চার মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৩৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ২ হাজার ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে এখনো গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন অনেকে।
শুক্রবার রাতে সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন বাদী হয়ে সদর উপজেলার সাতপাড়ে পুলিশের গাড়ি পোড়ানো ও সড়কে গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করা হয়।
মামলায় ৫৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ঘটনায় গত বুধবার থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩০৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেলার পাঁচটি থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সদর থানায় নতুন ৪৪ জনসহ ৯২ জন, কাশিয়ানী থানায় নতুন ৩৩ জনসহ ৭৭ জন, মুকসুদপুরে নতুন ২২ জনসহ ৮৮ জন, টুঙ্গিপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২৭ জন ও কোটালীপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত বুধবার এনসিপির কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হামলা চালান। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করেন জেলা প্রশাসক ও ম্যাজিস্ট্রেট মুহম্মদ কামরুজ্জামান। রাতেই জারি করা হয় কারফিউ। পরে কারফিউর মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়।
তিন দিন পর শনিবার সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গোপালগঞ্জে কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। ফলে জনজীবনে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরছে। এতে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর থেকে বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। খুলতে শুরু করেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। কাজে বের হয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অনেকে। শহরের বেশিরভাগ দোকান বন্ধ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শহরের বিভিন্ন বাজার ও সড়ক ঘুরে দেখা যায়, সল্পপরিসরে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। চায়ের দোকান খুললেও আগের মতো জমেনি আড্ডা। লঞ্চঘাট এলাকায় দেখা যায় যাত্রী শূন্য যানবাহন দাঁড়িয়ে আছে। চৌরঙ্গী, বটতলা, কালিবাড়ী, বিসিকসহ থানাপাড়া এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে।
শহরের পাচুড়িয়া এলাকার রিকশাচালক মহিবুল বলেন, ‘আমি রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। তিন দিনে সব মিলিয়ে ১০০ টাকা আয় করেছি। ধার করে চাল কিনতে হয়েছে। আজ বের হয়েছি ভালো আয়ের আশায়।’
ডিসি রোডের ফল বিক্রেতা আরিফ মোল্লা বলেন, ‘গ্যাঞ্জামের কারণে কারফিউতে দোকান খুলতে পারিনি। আজ নয়টায় দোকান খুলে বসে আছি।’
নবীনবাগ এলাকায় কাঁচাবাজার করতে আসা চুমকি নামে তাঁদের একজন বলেন, ‘বাসায় কোনো বাজার ছিল না, তাই বাজার করতে এসেছি। গণহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে পুরুষদের বাজারে আসতে দিইনি, নিজেই এসেছি।’
লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয় লিমন নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, জরুরি কাজে শহরে এসেছিলাম। তবে কাজ হবে কি না জানি না। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ। এখনো চারদিকে আতঙ্ক। কখন জানি গ্রেপ্তার হই, এই ভয়ে আছি! বিভিন্ন এলাকায় রাতে অভিযান পরিচালনা করায় সাধারণ মানুষ অনেকেই ঘরবাড়ি ছাড়া।
বিসিক এলাকায় কথা হয় সুরুজ নামে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, কারফিউ নেই জেনে বাজার করতে এসেছি। শহরে লোকজনের আনাগোনা একদমই নেই। বাজার করছি, তবে ভেতরে ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে।
মাহমুদ মিয়া নামে এক ইজিবাইক চালক বলেন, গত তিন দিন ধরেই শহরে গাড়ি চালাচ্ছি। তবে ইনকাম নেই। আজকে কারফিউ নাই, ভাবছিলাম কিছু আয় হবে, তবে সেই পরিমাণ ইনকাম হচ্ছে না। মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয়, পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ড. রুহুল আমিন সরকার। তার সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। কারফিউ নেই, যার কারণে সাধারণ মানুষ অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। আমরা অভিযানও পরিচালনা করছি। তবে অভিযানে যেন নিরপরাধ কেউ আটক না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

 

জনপ্রিয়

এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা-সংর্ঘষ

গোপালগঞ্জে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, চার মামলায় আসামি ৩০০৮, গ্রেপ্তার ৩০৬

প্রকাশ : ১১:১৫:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা ঘিরে গোপালগঞ্জে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছে। এ নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মোট চারটি মামলা করা হলো।
এই চার মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৩৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ২ হাজার ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে এখনো গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন অনেকে।
শুক্রবার রাতে সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন বাদী হয়ে সদর উপজেলার সাতপাড়ে পুলিশের গাড়ি পোড়ানো ও সড়কে গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করা হয়।
মামলায় ৫৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ঘটনায় গত বুধবার থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩০৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেলার পাঁচটি থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সদর থানায় নতুন ৪৪ জনসহ ৯২ জন, কাশিয়ানী থানায় নতুন ৩৩ জনসহ ৭৭ জন, মুকসুদপুরে নতুন ২২ জনসহ ৮৮ জন, টুঙ্গিপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২৭ জন ও কোটালীপাড়ায় নতুন ১০ জনসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত বুধবার এনসিপির কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হামলা চালান। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করেন জেলা প্রশাসক ও ম্যাজিস্ট্রেট মুহম্মদ কামরুজ্জামান। রাতেই জারি করা হয় কারফিউ। পরে কারফিউর মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়।
তিন দিন পর শনিবার সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গোপালগঞ্জে কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। ফলে জনজীবনে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরছে। এতে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর থেকে বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। খুলতে শুরু করেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। কাজে বের হয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অনেকে। শহরের বেশিরভাগ দোকান বন্ধ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শহরের বিভিন্ন বাজার ও সড়ক ঘুরে দেখা যায়, সল্পপরিসরে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। চায়ের দোকান খুললেও আগের মতো জমেনি আড্ডা। লঞ্চঘাট এলাকায় দেখা যায় যাত্রী শূন্য যানবাহন দাঁড়িয়ে আছে। চৌরঙ্গী, বটতলা, কালিবাড়ী, বিসিকসহ থানাপাড়া এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে।
শহরের পাচুড়িয়া এলাকার রিকশাচালক মহিবুল বলেন, ‘আমি রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। তিন দিনে সব মিলিয়ে ১০০ টাকা আয় করেছি। ধার করে চাল কিনতে হয়েছে। আজ বের হয়েছি ভালো আয়ের আশায়।’
ডিসি রোডের ফল বিক্রেতা আরিফ মোল্লা বলেন, ‘গ্যাঞ্জামের কারণে কারফিউতে দোকান খুলতে পারিনি। আজ নয়টায় দোকান খুলে বসে আছি।’
নবীনবাগ এলাকায় কাঁচাবাজার করতে আসা চুমকি নামে তাঁদের একজন বলেন, ‘বাসায় কোনো বাজার ছিল না, তাই বাজার করতে এসেছি। গণহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে পুরুষদের বাজারে আসতে দিইনি, নিজেই এসেছি।’
লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয় লিমন নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, জরুরি কাজে শহরে এসেছিলাম। তবে কাজ হবে কি না জানি না। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ। এখনো চারদিকে আতঙ্ক। কখন জানি গ্রেপ্তার হই, এই ভয়ে আছি! বিভিন্ন এলাকায় রাতে অভিযান পরিচালনা করায় সাধারণ মানুষ অনেকেই ঘরবাড়ি ছাড়া।
বিসিক এলাকায় কথা হয় সুরুজ নামে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, কারফিউ নেই জেনে বাজার করতে এসেছি। শহরে লোকজনের আনাগোনা একদমই নেই। বাজার করছি, তবে ভেতরে ভেতরে আতঙ্ক কাজ করছে।
মাহমুদ মিয়া নামে এক ইজিবাইক চালক বলেন, গত তিন দিন ধরেই শহরে গাড়ি চালাচ্ছি। তবে ইনকাম নেই। আজকে কারফিউ নাই, ভাবছিলাম কিছু আয় হবে, তবে সেই পরিমাণ ইনকাম হচ্ছে না। মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয়, পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ড. রুহুল আমিন সরকার। তার সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। কারফিউ নেই, যার কারণে সাধারণ মানুষ অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। আমরা অভিযানও পরিচালনা করছি। তবে অভিযানে যেন নিরপরাধ কেউ আটক না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হচ্ছে।