ঢাকা ০৮:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা

জনসমুদ্রে সাত দফা দাবি

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশ : ০৩:২১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
  • ৯৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

স্বাধীনতার পর এই প্রথম এককভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক স্পেস না পাওয়া ১৬ বছরের পর জামায়াতের এই বিশাল জনসমাগম ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। একে অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সমাবেশ ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার শাহবাগ, টিএসসি, রমনা, পল্টনসহ আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে জনস্রোতের পথ। ফজরের নামাজের পর থেকেই সমাবেশস্থলে জমায়েত শুরু হয়। সকাল ১০টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না’। বেলা ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশের মূল পর্ব শুরু হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে সমাবেশে জামায়াত সাত দফা দাবি পেশ করেছে। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক মিত্রদের প্রতিও ছিল কড়া বার্তা।

সমাবেশে নেতা-কর্মীদের হাতে ছিল দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’। অনেকের গায়ে ছিল প্রতীক খচিত টি-শার্ট ও পাঞ্জাবি। সমাবেশ সফল করতে জামায়াতের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশস্থলে ১৫টি মেডিকেল বুথ স্থাপন করা হয়। ছিল ৩৩টি এলইডি ডিসপ্লে এবং তিন শতাধিক মাইক। শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছেন প্রায় ছয় হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। জামায়াতের নেতারা এই সমাবেশকে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনসমাগম বলে দাবি করেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটানো।

মিত্রদের প্রতি কড়া বার্তা
জামায়াতের এই সমাবেশে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও আমন্ত্রিত ছিলেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে ঐক্যের রাজনীতিতে সূক্ষ্ম ফাটলের চিত্র। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বাইরে সভা করেন, সমাবেশ করেন। বলে বেড়ান সংস্কার মানি। অথচ ঐকমত্য কমিশনের মিটিংয়ে বসলে কিচ্ছু মানি না ভাব দেখান।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা বলছেন পার্লামেন্টে বসে সংস্কার করবেন। কেন এমনটা মনে করছেন? আপনারা মনে করছেন আগামী নির্বাচনে আপনারা জিতবেন, নাকি দখল করবেন?’ তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলমও সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমাদের নতুন সংবিধান লাগবে। গণপরিষদ নির্বাচন লাগবে। বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশে বাংলাদেশপন্থি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থির জায়গা হবে না। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু স্বৈরাচারের প্রশ্নে অভ্যুত্থানের সব শক্তি একসঙ্গে থাকতে হবে। এই বাংলাদেশে আবার নতুন করে মুজিববাদী ভারতপন্থি শক্তিগুলো এখন সক্রিয় হচ্ছে। আমাদের মতবিরোধ থাকতে পারে তবে এই বাংলাদেশে বাংলাদেশপন্থি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থির জায়গা হবে না। এই বাংলাদেশে আর কোনো ভারতীয় আধিপত্যবাদের জায়গা হতে দেওয়া যাবে না। অন্য যে কোনো দেশের নামে বাংলাদেশ হতে দেওয়া যাবে না।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত না করে আপনারা নির্বাচনের দিকে হাঁটবেন না। তিনি নির্বাচনের আগে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ জানান, তারা জামায়াতের সাত দফা দাবিকে সমর্থন করেন।

সমাবেশে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী। এসময় তিনি আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। বিচার না পেলে ভাইকে ফিরিয়ে দেন বলেও আকুতি জানান তিনি। তিনি বলেন, আমি আজ এই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছি শুধু একটি দাবি নিয়ে। সেটা ১৬ জুলাই যখন আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছিল যে কারণে, সেই কারণের বাস্তবতা কি আমরা আজ পেয়েছি? সেই শহীদ ভাইয়ের হত্যার বিচার যদি আমরা না পাই, তাহলে আমাদের এই শহীদ ভাইদের আমরা ফেরত চাই। তাই আগে হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে তার পর নির্বাচন দিন।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, একটা লড়াই হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। আরেকটা লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কোনো এমপি-মন্ত্রী সরকারি প্লট নেবেন না। করমুক্ত গাড়িতে চড়বেন না। চাঁদা আমরা নেব না, নিতেও দেব না। দুর্নীতি আমরা করব না, করতেও দেব না।
শফিকুর রহমান বলেন, অহংকার করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কাউকে ছোট করে কথা না বলি। না হলে আমরা বুঝে নেব, স্বৈরাচারী বীজ তাদের মনে বাসা বেঁধেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আবু সাঈদরা যদি বুক পেতে না দিত, হয়তো আজকের বাংলাদেশ আমরা দেখতাম না। বক্তব্যের সময় তিনি দুইবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত গরমে তিনি মঞ্চে লুটিয়ে পড়েন। তবে কিছুটা সুস্থ হয়ে মঞ্চে বসেই তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন। তিনি জানান, সমাবেশে আসতে গিয়ে তাদের তিনজন কর্মী মারা গেছেন। তিনি তাদের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন।

নগরবাসীর ভোগান্তি
জামায়াতের এই বিশাল সমাবেশের কারণে ঢাকাবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। ভোর থেকে নেতাকর্মীদের আগমনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সমাবেশ শেষে বিকালে যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, পল্টন, গুলিস্তানসহ প্রায় পুরো শহরে যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতেও ছিল যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। বহু মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। অবশ্য, এই সম্ভাব্য ভোগান্তির জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে আগেই নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল।

সাত দফা দাবি ও নতুন লড়াইয়ের ডাক
সমাবেশের মধ্য দিয়ে জামায়াত সাত দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবিগুলো হলো : ১. সব গণহত্যার বিচার ২. রাষ্ট্রে প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার ৩. জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বাস্তবায়ন ৪. জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন ৫. সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন ৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ ৭. নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী করল। দলটি প্রমাণ করল, ১৬ বছর রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে থাকার পরও তাদের জনসমর্থনের ভিত্তি এখনো অটুট। তাদের ঘোষিত সাত দফা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তবে মিত্রদের প্রতি তাদের কঠোর বার্তা জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে, সোহরাওয়ার্দীর এই জনসমুদ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

জনপ্রিয়

রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা

জনসমুদ্রে সাত দফা দাবি

প্রকাশ : ০৩:২১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

স্বাধীনতার পর এই প্রথম এককভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক স্পেস না পাওয়া ১৬ বছরের পর জামায়াতের এই বিশাল জনসমাগম ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। একে অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সমাবেশ ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার শাহবাগ, টিএসসি, রমনা, পল্টনসহ আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে জনস্রোতের পথ। ফজরের নামাজের পর থেকেই সমাবেশস্থলে জমায়েত শুরু হয়। সকাল ১০টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না’। বেলা ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশের মূল পর্ব শুরু হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে সমাবেশে জামায়াত সাত দফা দাবি পেশ করেছে। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক মিত্রদের প্রতিও ছিল কড়া বার্তা।

সমাবেশে নেতা-কর্মীদের হাতে ছিল দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’। অনেকের গায়ে ছিল প্রতীক খচিত টি-শার্ট ও পাঞ্জাবি। সমাবেশ সফল করতে জামায়াতের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশস্থলে ১৫টি মেডিকেল বুথ স্থাপন করা হয়। ছিল ৩৩টি এলইডি ডিসপ্লে এবং তিন শতাধিক মাইক। শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছেন প্রায় ছয় হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। জামায়াতের নেতারা এই সমাবেশকে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনসমাগম বলে দাবি করেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটানো।

মিত্রদের প্রতি কড়া বার্তা
জামায়াতের এই সমাবেশে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও আমন্ত্রিত ছিলেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে ঐক্যের রাজনীতিতে সূক্ষ্ম ফাটলের চিত্র। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বাইরে সভা করেন, সমাবেশ করেন। বলে বেড়ান সংস্কার মানি। অথচ ঐকমত্য কমিশনের মিটিংয়ে বসলে কিচ্ছু মানি না ভাব দেখান।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা বলছেন পার্লামেন্টে বসে সংস্কার করবেন। কেন এমনটা মনে করছেন? আপনারা মনে করছেন আগামী নির্বাচনে আপনারা জিতবেন, নাকি দখল করবেন?’ তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলমও সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমাদের নতুন সংবিধান লাগবে। গণপরিষদ নির্বাচন লাগবে। বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশে বাংলাদেশপন্থি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থির জায়গা হবে না। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু স্বৈরাচারের প্রশ্নে অভ্যুত্থানের সব শক্তি একসঙ্গে থাকতে হবে। এই বাংলাদেশে আবার নতুন করে মুজিববাদী ভারতপন্থি শক্তিগুলো এখন সক্রিয় হচ্ছে। আমাদের মতবিরোধ থাকতে পারে তবে এই বাংলাদেশে বাংলাদেশপন্থি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থির জায়গা হবে না। এই বাংলাদেশে আর কোনো ভারতীয় আধিপত্যবাদের জায়গা হতে দেওয়া যাবে না। অন্য যে কোনো দেশের নামে বাংলাদেশ হতে দেওয়া যাবে না।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত না করে আপনারা নির্বাচনের দিকে হাঁটবেন না। তিনি নির্বাচনের আগে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদ জানান, তারা জামায়াতের সাত দফা দাবিকে সমর্থন করেন।

সমাবেশে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী। এসময় তিনি আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। বিচার না পেলে ভাইকে ফিরিয়ে দেন বলেও আকুতি জানান তিনি। তিনি বলেন, আমি আজ এই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছি শুধু একটি দাবি নিয়ে। সেটা ১৬ জুলাই যখন আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছিল যে কারণে, সেই কারণের বাস্তবতা কি আমরা আজ পেয়েছি? সেই শহীদ ভাইয়ের হত্যার বিচার যদি আমরা না পাই, তাহলে আমাদের এই শহীদ ভাইদের আমরা ফেরত চাই। তাই আগে হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে তার পর নির্বাচন দিন।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, একটা লড়াই হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। আরেকটা লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কোনো এমপি-মন্ত্রী সরকারি প্লট নেবেন না। করমুক্ত গাড়িতে চড়বেন না। চাঁদা আমরা নেব না, নিতেও দেব না। দুর্নীতি আমরা করব না, করতেও দেব না।
শফিকুর রহমান বলেন, অহংকার করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কাউকে ছোট করে কথা না বলি। না হলে আমরা বুঝে নেব, স্বৈরাচারী বীজ তাদের মনে বাসা বেঁধেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আবু সাঈদরা যদি বুক পেতে না দিত, হয়তো আজকের বাংলাদেশ আমরা দেখতাম না। বক্তব্যের সময় তিনি দুইবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত গরমে তিনি মঞ্চে লুটিয়ে পড়েন। তবে কিছুটা সুস্থ হয়ে মঞ্চে বসেই তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন। তিনি জানান, সমাবেশে আসতে গিয়ে তাদের তিনজন কর্মী মারা গেছেন। তিনি তাদের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন।

নগরবাসীর ভোগান্তি
জামায়াতের এই বিশাল সমাবেশের কারণে ঢাকাবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। ভোর থেকে নেতাকর্মীদের আগমনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সমাবেশ শেষে বিকালে যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, পল্টন, গুলিস্তানসহ প্রায় পুরো শহরে যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতেও ছিল যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। বহু মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। অবশ্য, এই সম্ভাব্য ভোগান্তির জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে আগেই নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল।

সাত দফা দাবি ও নতুন লড়াইয়ের ডাক
সমাবেশের মধ্য দিয়ে জামায়াত সাত দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবিগুলো হলো : ১. সব গণহত্যার বিচার ২. রাষ্ট্রে প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার ৩. জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বাস্তবায়ন ৪. জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন ৫. সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন ৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ ৭. নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী করল। দলটি প্রমাণ করল, ১৬ বছর রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে থাকার পরও তাদের জনসমর্থনের ভিত্তি এখনো অটুট। তাদের ঘোষিত সাত দফা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তবে মিত্রদের প্রতি তাদের কঠোর বার্তা জাতীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে, সোহরাওয়ার্দীর এই জনসমুদ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।