মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণাতেই রপ্তানিকারকদের কপালে পড়েছিল চিন্তার বড় ভাঁজ। এই নিয়ে গত ২ এপ্রিল থেকে ঘুম উড়ে যাওয়ার দশা ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকদের। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক পূর্বঘোষিত ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করায় সেই চিন্তা অনেকটা লাঘব হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক শীর্ষ বড় এই বাজারকে কেন্দ্র কওে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। আবার সম্ভাবনাও কম নয়। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রপ্তানি বাজারে পাল্টে যেতে পারে সমীকরণ। স্বল্পকালীন সময়ে কিছুটা ক্রয়াদেশ কমলেও দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা বলছেন, পাল্টা শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তারপরও রপ্তানি বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি হবে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক থাকায় সেখান থেকে প্রচুর কার্যাদেশ সরবে। তার একটা অংশ পেতে পারে বাংলাদেশ। তা ছাড়া ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক ২৫ শতাংশ থাকা বায়াররা বাংলাদেশের বাজারকে পছন্দে নিতে পারে।
এ বিষয়ে পোশাকশিল্পের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ২০ শতাংশ শুল্কহার শুনে অনেক স্বস্তি পাচ্ছি। কারণ, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা সবাই প্রায় এই হারেই রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ারদের জন্য এটি একটি বাড়তি খরচ। ফলে আমাদের রপ্তানিতে কিছুটা চাপ তৈরি হবে; বিশেষ করে দামের ক্ষেত্রে।
কোথায় ছাড় দিল বাংলাদেশ:
অনেকটা গোপন শর্ত নির্ভর করেই বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কহার কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন বা শুল্ক কমানোর পেছনে বাংলাদেশকে কতটা ছাড় দিতে হয়েছে, বিনিময়ের বিষয় কী হতে পারে, এসব প্রশ্নে কোনো পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দেন-দরবার করে পাল্টা শুল্ক ৩৫ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার কাজটাও সহজসাধ্য ছিল না। এটুকু অর্জনের জন্য তিন মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু করতে হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক গড় বাণিজ্য ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৬ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি করে গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের মতো। বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি ৩ বিলিয়ন ডলার কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বাড়াবে বাংলাদেশ। এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেই পথনকশাও জানিয়েছে দেশটিকে। শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, বাংলাদেশ আরও বেশ কিছু বাণিজ্য ও অ-বাণিজ্য শর্তে রাজি হয়েই পাল্টা শুল্কে এই ছাড় আদায় করেছে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে গোপনীয়তার চুক্তির (এনডিএ) কারণে সব শর্ত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই থেকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও তুলা আমদানির আগাম চুক্তি হয়েছে। দেওয়া হয়েছে দেশটির বোয়িং কোম্পানি থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছিলেন, অন্য দেশগুলোও এমন প্রস্তাব দিয়েছে, তারা আমদানি বাড়াবো, এটা-ওটা কিনবে। আমরাও তাই করেছি। যদিও আমরা শর্তের সব বিস্তারিত জানি না। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো বলে মনে হয় না। কতটা লাভ হবে, সেটা প্রশ্ন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার গণমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ আপাতত বাংলাদেশের জন্য সন্তোষজনক। তবে শুল্কছাড়ের পেছনে কী কী শর্ত বা প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা এখনো পরিপূর্ণভাবে জানা যায়নি সেই বিবেচনা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বোয়িং বিমান কেনা বা অন্য কোনো বিষয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা থাকলেও তা কতটা বাংলাদেশের পক্ষে সহনীয়, তা বিশ্লেষণ জরুরি। এটি শুধু শুল্ক নয়, বরং অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়; যা পুরোপুরি খোলাসা করা উচিত।
অবশ্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এ প্রসঙ্গে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করেছি, যাতে প্রতিশ্রুতিগুলো আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। পোশাকশিল্প রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, তবে পাশাপাশি কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে; বিশেষত মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি নিয়ে। গম, তুলা এমনকি বিমান আমদানির বিষয়েও আমরা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছি। এটি শুধু আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নেও সহায়ক।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা কতটুকু
পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নেমে আসায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছেন দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীরা। কারণ, পাল্টা শুল্কের এই হার পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর সমান বা কিছুটা কম। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ১০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে ভিয়েতনাম, চীন, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও কোরিয়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভিয়েতনামের পণ্যে ২০ শতাংশ, চীনা পণ্যে ৩০, বাংলাদেশের পণ্যে ২০, ভারতের পণ্যে ২৫, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের পণ্যে ১৯ এবং কোরিয়ার পণ্যে ১৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে চীন ও ভিয়েতনাম। আর বাংলাদেশের নিচেই রয়েছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কারোপের ফলে চীন এবং ভারতে শুল্কহার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হবে। আর ভিয়েতনামের হবে বাংলাদেশের সমান।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, পাল্টা শুল্ক কমে আসা নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। তবে বাড়তি শুল্কের কারণে আগামী কয়েক মাস ক্রয়াদেশ কম থাকতে পারে। এই সময়ে ছোট ও মাঝারি কারখানা যেন ব্যবসা থেকে ছিটকে না যায়, সেটি সরকারকে নজরদারিতে রাখতে হবে। পাল্টা শুল্কের এই হার বজায় থাকলে অবশ্যই তৈরি পোশাকের ব্যবসায় নতুন সুযোগ আসবে।
এই বাস্তবতায় শুল্ক হ্রাসকে স্বস্তি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানও। তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর কী শুল্ক নির্ধারণ করে, সেটাই এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ওপর শুল্ক বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ও সাউথইস্ট এশিয়ান দেশের জন্য সুযোগ তৈরি হবে, না হলে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘এই শুল্ককাঠামো প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে। এখানে শুধু ঘাটতি নয়, কে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে, কে প্রতিশ্রুতি দেয়; সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতের পণ্যে বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ওই দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশের প্রায় সমতুল্য, অর্থাৎ গড়ে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কহার ধার্য করা হয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তিনি মনে করছেন, তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প, সব খাতের বাজার বিস্তৃত করার এটাই সুযোগ। কারণ ভারতের জন্য শুল্কহার বেশি হওয়ার ফলে বায়াররা গার্মেন্টের ক্ষেত্রে সে দেশে বাণিজ্য করতে বেশি আগ্রহী হবে না।
ব্রেকিং নিউজ
বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কারোপ
চ্যালেঞ্জ হলেও সম্ভাবনাময়
-
দেশ প্রতিবেদক - প্রকাশ : ০৩:২৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫
- ১৪১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জনপ্রিয়










