ঢাকা মহানগরীর সরকারি সাত কলেজের জন্য প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা হবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও হাইব্রিড ধরনের। ৪০ শতাংশ ক্লাস হবে অনলাইনে, আর বাকি ৬০ শতাংশ ক্লাস সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে। তবে সব ধরনের পরীক্ষা সশরীরে হবে।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু থাকবে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠদান। আর বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে চারটি অনুষদের অধীনে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে।
সোমবার সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরীর সরকারি ৭ কলেজের জন্য প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সচিবের রুটিন দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শিক্ষার্থী প্রথম চারটি সেমিস্টারে নন-মেজর কোর্স অধ্যয়ন করবেন। পরবর্তী চার সেমিস্টার ডিসিপ্লিন অনুযায়ী মেজর কোর্স অধ্যয়ন করবেন। তবে পঞ্চম সেমিস্টারে শর্তপূরণ সাপেক্ষে শিক্ষার্থীরা ইচ্ছানুযায়ী ডিসিপ্লিন পরিবর্তন করতে পারবেন। তবে ক্যাম্পাস পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনকার মতো একেকটি কলেজে সব বিষয় পড়ানো হবে না। এক বা একাধিক কলেজে স্কুলভিত্তিক ক্লাস হবে। সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মধ্যে স্কুল অব সায়েন্সের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাস। স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের জন্য সরকারি বাঙলা কলেজ, স্কুল অব বিজনেসের জন্য সরকারি তিতুমীর কলেজ, স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিসের জন্য কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ক্যাম্পাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবার জন্য সুবিধাজনক স্থানে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস নির্ধারণ করা হবে জানিয়ে বলা হয়, কলেজগুলোর বিদ্যমান উচ্চমাধ্যমিকের সুযোগ অক্ষুন্ন থাকবে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও কলেজগুলোতে থাকবেন। তবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের জন্য শিক্ষক ঠিক করা হবে। এ বছরের মধ্যেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধ্যাদেশ জারি হবে। তবে এবারের ভর্তি কার্যক্রম বিদ্যমান নিয়মেই হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয়ে মজিবর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে একাডেমিক কাউন্সিল, সিনেট ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রক্টর থাকবেন। এছাড়াও প্রতিটি কলেজে একজন পুরুষ এবং একজন নারী ডেপুটি প্রক্টর থাকবেন। অর্থাৎ ৭ কলেজে সর্বমোট ১৪ জন ডেপুটি প্রক্টর থাকবেন।
সাত কলেজের পাঁচটিতে আগের মতো উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় চালু থাকবে জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব বলেন, স্নাতক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা টাইম, স্পেস ও রিসোর্স শেয়ারিং পদ্ধতিতে একই ক্যাম্পাস ব্যবহার করবেন। কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। প্রতি ডিসিপ্লিনে যৌক্তিকভাবে ছাত্র সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রথম বর্ষেই ল্যাপটপ ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে ও স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। সব প্রশাসনিক কার্যক্রম (ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, আবেদন ইত্যাদি) আইটি বেজড/ডিজিটাল সিস্টেমে সম্পাদিত হবে। এছাড়াও শিক্ষার্থীরা যে কোনো ধরনের অনুসন্ধান আইটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করতে পারবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। কলেজগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ করাদের বণ্টন করা হবে। বাজেট গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। প্রতিটি কলেজে আধুনিক মানসম্পন্ন লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া ও মেডিকেল সেন্টার ও পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা আগের বিদ্যমান একাডেমিক কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করবেন। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সময়মতো পরীক্ষা, রেজাল্ট দ্রুত প্রকাশ, সেশনজট কমাতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন খান বলেন, কলেজের যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে আমরা কোনো পরিবর্তন আনছি না। কলেজ কলেজের জায়গায়ই থাকছে। কলেজের শিক্ষকরা কলেজেই থাকছেন। বিদ্যমান কাঠামোতে কলেজের শিক্ষকরাই পাঠদান করছেন। যখন বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো কলেজের কাঠামোর সঙ্গে একীভূত থাকবে না। তখন নিয়োগ হবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যে যোগ্যতা বলে নিয়োগ দেওয়া হয় সেই অনুযায়ী। কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আসতে চান, যারা যোগ্য আছেন তারা সাধারণ যে প্রক্রিয়া আছে সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসবেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইউজিসি চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান, সাত কলেজের অন্তর্র্বতী প্রশাসক ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় ইউনিভার্সিটিতে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির আবেদন রোববার (৩ আগস্ট) শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন ১০ আগস্ট পর্যন্ত। আবেদন ফি ৮০০ টাকা। অনলাইনে এ আবেদন নেওয়া হবে।
এর আগে রোববার ঢাকা কেন্দ্রীয় ইউনিভার্সিটির ভর্তি আবেদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি চারটি অনুষদের অধীনে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে এবার শিক্ষার্থী ভর্তি নেবে। আবেদন করতে হবে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত সাত কলেজের মোট আসন আছে ৪ হাজার ৭৭৩টি। এর মধ্যে ঢাকা কলেজে ৭৭৫টি, ইডেন মহিলা কলেজে ৮৭৬, সরকারি তিতুমীর কলেজে ৮২০, সরকারি বাঙলা কলেজে ৭১১, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ৫৭৬, সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে ৫২০, কবি নজরুল সরকারি কলেজে ৪৯৫টি আসনে ভর্তি করা হবে। ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে শুধু ছাত্রী, আর ঢাকা কলেজে শুধু ছাত্র ভর্তির সুযোগ পাবে। বাকি চার কলেজে ছাত্রীছাত্র উভয়েই ভর্তি হতে পারবেন। এরই মধ্যে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজে প্রাথমিক আবেদন করেছেন, তাদের পুনরায় আবেদন করতে হবে না; আগের আবেদনই ডিসিইউ আবেদন হিসেবে গণ্য হবে।
ভর্তি পরীক্ষা, নম্বর বণ্টন ও ভর্তিচ্ছুদের করণীয় : বাংলা-২৫, ইংরেজি-২৫, সাধারণ জ্ঞান-৫০: বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে গঠিত সমাজবিজ্ঞান, পৌরনীতি ও সুশাসন, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, ভূগোল ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন থাকবে। মোট ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান- এ তিন বিষয়ে ১০০টি প্রশ্ন থাকবে। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ২০২৪ সালের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যসূটি অনুযায়ী হবে উল্লিখিত তিন বিষয়ের নম্বর। ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে পাস নম্বর ৪০। যারা ৪০-এর কম পাবেন, তাদের ভর্তির জন্য বিবেচনা করা হবে না। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা যাবে। পরীক্ষার উত্তরপত্র (একটি ওএমআর শিট) বিশ্ববিদ্যালয় সরবরাহ করবে। অতিরিক্ত কোনো শিট দেওয়া হবে না। সরবরাহকৃত উত্তরপত্রের (ওএমআর শীট -এ) প্রশ্নের উত্তর বৃত্ত পূরণ করে চিহ্নিত করতে হবে।
প্রার্থী কোনো অবস্থাতেই মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, বই ও কাগজপত্র (প্রবেশপত্র ছাড়া), যে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসুসংবলিত ঘড়ি ও কলম, ভিসা/মাস্টারকার্ড/ এটিএম কার্ড ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
আবেদনের যোগ্যতা: মাধ্যমিক বা সমমান পরী¶া ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এবং ২০২৩ অথবা ২০২৪ সালের উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা ঢাকা কেন্দ্রীয় ইউনিভার্সিটি (প্রস্তাবিত) বিভিন্ন ইউনিটে বিদ্যমান একাডেমিক কাঠামোতে (সনাতন) ভর্তির জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন, শুধু তারাই ২০২৪-২৫ শি¶াবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অধিভুক্ত সাত কলেজে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য এরই মধ্যে আবেদন করেছেন, তাদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই। তাদের আগের আবেদনই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে যারা আবেদন প্রত্যাহার করবেন তাদের জমা করা টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ভর্তির বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ২২ আগস্ট (শুক্রবার), বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। বিজ্ঞান ইউনিটের ২৩ আগস্ট (শনিবার), বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের ২৩ আগস্ট (শনিবার), বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া আগামী ১৭ আগস্ট থেকে সফলভাবে আবেদন করা শিক্ষার্থীরা প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে পারবেন। এরপর ২০ আগস্ট আসনবিন্যাস প্রকাশ করা হবে।
দেশ প্রতিবেদক 

















