আসন্ন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট গঠনের এক জটিল ও উত্তেজনাকর প্রক্রিয়া চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ তৈরি হওয়ায়, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন করে ঘুঁটি সাজাচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ‘সমমনা’ দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গঠনের প্রচেষ্টা। তবে এই জোটের পথে পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র অবস্থান এক জটিল ও আকর্ষণীয় মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল একত্রিত হয়ে একটি তৃতীয় শক্তি গঠনের চেষ্টা করছে। এই জোটের লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির দাবি তোলা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতেÑ সমমনাদের জোট গঠনের উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও এই জোটের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, তবে তারা যদি আদর্শিক ঐক্য ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই জোটের সফলতা নির্ভর করবে তাদের কৌশল, জনসম্পৃক্ততা এবং নেতৃত্বের দক্ষতার ওপর। যদিও আদর্শিক পার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং জনসমর্থনের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে বিএনপির জোট গঠন নিয়ে রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। জামায়াতে ইসলামী বিএনপির ঐতিহ্যগত মিত্র, কিন্তু ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর থেকে দলটির সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। তাই বিএনপি ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মতো দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। জাতীয় পার্টিরও বিভক্ত অবস্থান। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গ্রুপ ইতোমধ্যে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আর রওশন এরশাদ গ্রুপের কিছু নেতা বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ছোট দল ও গণতন্ত্রকামী গোষ্ঠীর মধ্যে গণফোরামের ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনি জোটে যেতে আগ্রহী, তবে শর্তসাপেক্ষে। তবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) ওলি আহমদের দলটি বিএনপির জোটের আওতায় আসতে পারে।
জোট গঠনের পটভূমি:-
বিএনপি, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর, যেখানে ভোটার উপস্থিতি মাত্র ২৭ দশমিক ১৫% থেকে ৪০% এর মধ্যে ছিল বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করলেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে, বিএনপি এবার ত্রয়োদশ নির্বাচনে শক্তিশালীভাবে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিএনপি একটি গণমানুষের দল হিসেবে সকল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী এবং বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিএনপির কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গঠন করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, বিএনপি এবার জোট গঠনের মাধ্যমে ভোটের মাঠে বৈচিত্র্যময় সমর্থন বেস তৈরি করতে চাইছে। তবে, জোটের মধ্যে আদর্শিক এবং কৌশলগত পার্থক্য মোকাবিলা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
জামায়াতের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশের ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে। ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে তাদের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর থেকে তারা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, তবে বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। সম্প্রতি, নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল করেছে, যা তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জোট গঠনের বিষয়ে বলেন, আমরা বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় আছি। তবে, জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের আইনি ভিত্তি নিয়ে আমাদের কিছু আপত্তি রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুল হক মনে করেন, জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল তাদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। তাই কৌশলগত কারণে বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের ক্ষেত্রে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়া স্বাভাবিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবা রউফ বলেন, জামায়াত কখনোই রাজনৈতিক মাঠ থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি। তারা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এবং ভোটব্যাংক ধরে রেখেছে। আর বর্তমান বাস্তবতায় নিষিদ্ধ হওয়ায়, দেশের বৃহৎ একটি দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তাই বিএনপির সঙ্গে তাদের ‘আনুষ্ঠানিক নয়, কার্যকরী’ সম্পর্ক বরাবরই ছিল।
এনসিপি নতুন শক্তির উত্থান:-
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এই দলটি ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যা গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এনসিপি জুলাই সনদের ২০টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ১৮টিতে সম্মতি দিয়েছে, যা তাদের বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং জনপ্রিয়তার সীমাবদ্ধতা জোটে তাদের প্রভাব সীমিত করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এনসিপি তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা জোট গঠনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে, তাদের গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তি তাদের আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
অন্যান্য দল ও জোটের সম্ভাবনা:-
বিএনপির সঙ্গে ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা চলছে। তবে, আদর্শিক এবং কৌশলগত পার্থক্য জোট গঠনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের বিষয়ে বিএনপি এবং ১২ দলীয় জোট বিরোধিতা করেছে, যেখানে জামায়াত এবং এনসিপি এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এ ছাড়াও, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), যারা জামায়াতের সংস্কারপন্থিদের দ্বারা গঠিত, জোট গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এবি পার্টির আহ্বায়ক এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরী জানিয়েছেন, আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে রাজনীতি করতে চাই। বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে, তবে আমরা আমাদের মূলনীতির সঙ্গে আপোস করব না।
ইসির ভূমিকা ও সংস্কার প্রক্রিয়া:-
নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন, যাকে সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গত এক বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নির্বাচন কমিশন নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, যার মাধ্যমে আরও দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন ছাড়া বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারগুলো নির্বাচনের আগে কার্যকর করার বিষয়ে বিএনপি সম্মতি দিয়েছে। তবে, সংস্কারের আইনি ভিত্তি নিয়ে জামায়াত এবং এনসিপির মতো দলগুলোর আপত্তি রয়েছে। বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের আগে সংস্কার বাস্তবায়ন জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সকল দলের মতামত গ্রহণ না করলে এই প্রক্রিয়া বিতর্কিত হতে পারে।
জনপ্রত্যাশা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ:-
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের এক বছরের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত। তিনি জানান, জনগণ আগামী রমজানের আগে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে, যা বিএনপির নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় সমর্থিত হয়েছে।
তবে, জোট গঠনের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিএনপি এবং তাদের সমমনা জোট, যেমন ১২ দলীয় জোট এবং এলডিপি, সংসদের উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে, জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে সদস্য মনোনয়ন করা উচিত। এই মতপার্থক্য জোট গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকর মনে করছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে সমমনা দলগুলোর জোট গঠনের সম্ভাবনা দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো দলগুলোর অংশগ্রহণ এই জোটকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে আদর্শিক এবং কৌশলগত পার্থক্য মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রচেষ্টা এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে সকল দলের সহযোগিতা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ব্রেকিং নিউজ
কৌশলে বিএনপি, সক্রিয় জামায়াত ও এনসিপি
জোট রাজনীতির হাওয়া
-
বিশেষ প্রতিনিধি - প্রকাশ : ০৬:২৫:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫
- ১৯৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয়










