ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এবং প্রশাসনিক ক্যাডারে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও পদোন্নতির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসংক্রান্ত বৈঠকে এ তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, জনবলের স্বল্পতা নিরসন, সহিংসতা রোধ, পোলিং অফিসার নিয়োগ এবং নির্বাচন দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে এক লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে গত বছরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ১৫৪৯ জনকে, নতুন করে আরও৫০০ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনটিআরসি এবং প্রাথমিক শিক্ষক মিলে ৮০ হাজার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীতে ২০ হাজার জনবল নিয়োগ দেবে সরকার। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার জন নিয়োগ দেওয়া হবে বাংলাদেশ পুলিশে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) নিয়োগ দেওয়া হবে পাঁচ হাজার ৫১৩ জন।এছাড়া আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে দুই হাজার ১৪৫ জন এবং কোস্ট গার্ডে ৬৩৪ জন নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রধানউপদেষ্টার কার্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচনি দায়িত্বভিত্তিক প্রশিক্ষণ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সংস্কারসংক্রান্ত এক সভায় এই নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এনটিএমসি) আতাউর রহমান খান জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন শেষে ফাইল এখন অর্থ বিভাগে রয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন, প্রাথমিকে ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার প্রধান শিক্ষক পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ করা হচ্ছে।
অপরদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) নতুন নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে কাজ করছে। বিধিমালা শেষ হলে প্রায় ৫০ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। বিধিমালায় থাকবে না পোষ্য ও নারী কোটা। ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীতে বিশাল নিয়োগের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী শাসনামলে অনেক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দলীয় ব্যানারে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাদের কিছু সদস্য আত্মগোপনে গেলেও বড় একটি অংশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘাপটি মেরে আছে।তারা সরকারকে নানাভাবে বিব্রত করার অপচেষ্টা করছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাই আগামী নির্বাচনে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পাশাপাশি নতুন নিয়োগ হওয়া সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পুলিশে ১১ হাজার কনস্টেবল, বিজিবিতে পাঁচ হাজার ৫১৩ জন, আনসারে দুই হাজার ১৪৫ জন এবং কোস্ট গার্ডে ৬৩৪ জন নতুন সদস্য নিয়োগ দিতে হবে। দ্রুত নিয়োগ দিয়ে তাঁদের নির্বাচনি দায়িত্বভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
নির্বাাচনকালীন জনবল প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে আট লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন এবং তাদের সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে পুলিশ থাকবে এক লাখ ৪১ হাজার, অঙ্গীভূত ও সাধারণ আনসার অস্ত্রসহ থাকবে ৪৭ হাজার, অস্ত্র ও লাঠিসহ আনসার থাকবে ৪৭ হাজার, লাঠিসহ আনসার চার লাখ ৭০ হাজার, লাঠিসহ গ্রাম পুলিশ, দফাদার ও মহল্লাদার ৯৪ হাজার। প্রিসাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তার জন্যও গার্ড দেওয়া হবে।
এক বছরে প্রশাসনে পদোন্নতি পেয়েছেন ১৫৪৯ কর্মকর্তা
অর্ন্তর্বতী সরকারের গত এক বছরে প্রশাসনে পদোন্নতি পেয়েছেন ১ হাজার ৫৪৯ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন ৭৮৫ জন। বাকি ৭৬৪ জন আওয়ামী আমলে বঞ্চিত বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত কর্মকর্তা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়েছেন। এ ছাড়া জনস্বার্থে প্রশাসনের ৯ সচিবসহ ২৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্টের পর গত এক বছরে উপসচিব পদে ১৪১ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৪২৪, অতিরিক্ত সচিব পদে ১৪৯, গ্রেড-১ পদে ২৬ এবং সচিব বা সিনিয়র সচিব পদে ৪৫ জনসহ মোট ৭৮৫ জন কর্মকর্তাকে নিয়মিত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উপসচিব পদে ৪ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৭২, অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮, গ্রেড-১ পদে ৪১ এবং সচিব পদে ১১৯ জনসহ মোট ৭৬৪ জন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে উপসচিব পদের ১৬ জন, যুগ্ম সচিব পদের ১৫, অতিরিক্ত সচিব পদের ৭৫, গ্রেড-১ পদের ৩৪ এবং সচিব/সিনিয়র সচিব পদের ২৪ জনসহ মোট ১৬৪ জন কর্মকর্তাকে কর্মকাল শেষে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে তিন স্তরের পদোন্নতি
প্রশাসনে আবার তিন স্তরের পদোন্নতির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝিতে বিসিএস ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরে যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি এই পদে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।এর পরই বিসিএস ২৪তম ব্যাচের ‘পদোন্নতিবঞ্চিত’ ১৮২ জন কর্মকর্তার অনেককে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এরই মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য আটশর বেশি কর্মকর্তার চাকরিজীবনের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করেছে সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, পদায়ন পনোন্নতি রুটিন ওয়ার্ক। তিন স্তরের পদোন্নতির বিষয়ে কাজ চলছে। মধ্য আগস্টের দিকে উপসচিব এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে অতিরিক্ত ও যুগ্ম সচিবের পদোন্নতিরসম্ভাবনা রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের ২১২ পদে কর্মকর্তা আছেন ৩৫৮ জন। যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদে রয়েছেন এক হাজার ২৮ জন। সুপারনিউমারারি পদসহ উপসচিবের অনুমোদিত পদসংখ্যা এক হাজার ৪২০। বিপরীতে কর্মরত আছেন এক হাজার ৪০০ জন। ফলে পদ খালি না থাকায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আগের পদেই কাজ করে যেতে হবে।
পদোন্নতির বিধিমালা অনুযায়ী, সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পাঁচ বছর চাকরিসহ অন্তত ১০ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকলেই উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার কথা। বিসিএস ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন ২০২২ সালের ৩ জুন। কিন্তু এখনো তাদের পদোন্নতি হয়নি।
উপসচিব: শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১২ সালের ৩ জুন সরকারি চাকরিতে যোগ দেন বিসিএস ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। সেই হিসাবে তাদের উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জিত হয় ২০২২ সালের ৩ জুন। তবে নানা কারণে ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি উপসচিব পদে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের তথ্য চেয়ে পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই ব্যাচে ২৭৭ জন কর্মকর্তা ২০১২ সালে যোগদান করেন। লেফট আউটসহ প্রশাসন ক্যাডারের ৩১৯ কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে আড়াইশ কর্মকর্তার পদোন্নতি হতে পারে বলে জানা গেছে।
অতিরিক্ত সচিব : যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিতে নিয়মিত হিসেবে ২০তম ব্যাচকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এবারের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য প্রশাসন ক্যাডারের ২৪৪ কর্মকর্তার পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডার থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। সব মিলে পদোন্নতির জন্য প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যাচের ৪৩ কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং ৪০ কর্মকর্তা মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে না।
যুগ্ম সচিব : ২০ মার্চ প্রশাসনে বিসিএস ২৪তম ব্যাচসহ অতীতে ‘বঞ্চিত’ ১৯৬ জন কর্মকর্তকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার। নানা জটিলতায় ২৪তম ব্যাচের পাঁচজন জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) অন্তত ১৮২ জন কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল। এর পরই ‘বঞ্চিতরা’ গণহারে আবেদন করলে পদোন্নতি রিভিউয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়।
মাহমুদুল করিম খান 









