ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব

ব্যবসায়ীরা হতাশ, আশা দেখালেন গভর্নর

  • দেশ প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ১২:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৮৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহার যে পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা হতাশ। তবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আশা দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বিনিয়োগ সংলাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়ে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী নেতা ও শিল্প উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

সংলাপে এপেক্স গ্রুপের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আপনার (গভর্নর) কাছে একটা বিনীত নিবেদন, বিজনেস পিপলরা এই ইন্টারেস্ট সইতে পারছি না। আমাদের জন্য ইমপসিবল হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্যার, আমরা সুদের হারের বিপক্ষে না। তবে এখন ব্যবসা করা ভেরি ভেরি ডিফিকাল্ট এবং এই ইন্টারেস্ট রেটটা কীভাবে কমানো যায়। বিশেষ করে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দুটো দেশ বেঞ্চমার্ক। ভিয়েতনাম এবং ইন্ডিয়া- তাদের সাথে আমরা পারছি না। এই কস্ট অব ক্যাপিটাল ফর ম্যানুফ্যাকচারিং লং টার্ম, শর্ট টার্ম কীভাবে কমানো যায়।
নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘অগ্রিম কর ও উৎসে কর হচ্ছে কর-সন্ত্রাস (ট্যাক্স টেররিজম)। এটা বন্ধ করতে হবে। আমরা লাভ করি বা লোকসান করি-সব অবস্থাতেই আমরা কর দিয়ে যাচ্ছি। এমনও হয়েছে যে লোকসান করেছি বেশি, আবার করও বেশি দিয়েছি। এই অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআর বিভিন্ন সংস্কার ইতিমধ্যে করেছে। তাতে বন্ড অটোমেশন হয়েছে ও এইচএস কোডের যে “টেররিজম” ছিল, সেখানে থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। এখন অগ্রিম কর ও উৎসে কর থেকে মুক্তি চাই।’
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু ব্যবসায়ীরা বিত্তবান হয়েছে, নাকি আমলারাও হয়েছেন-এই কথাটা বলা হয় না। যে টাকা পাচার করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার করেছেন আমলারা। আমরা ব্যবসায়ীরা এ দায় নিতে চাই না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা টাকা চুরি করেন, গ্যাস চুরি করেন, তাঁদের ধরেন, আইনের আওতায় আনেন। ওনাদের দায় যেন আমাদের ওপরে না আসে।’
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো বিদেশি অংশীদারদের কথা শুনে চলা ব্যবসায়ীরা সমর্থন করে না বলে মন্তব্য করেন নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘আপনাদের চার বিলিয়ন, পাঁচ বিলিয়ন—যে অর্থ লাগবে, আমরা রপ্তানি থেকে এনে দেব। কিন্তু তাদের সব জায়গায় অনুসরণ করা উচিত হবে না।’
এ ছাড়া রপ্তানিতে ইডিএফ তহবিল পুনরায় চালু করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করা, ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধান করার অনুরোধ জানান নাসিম মঞ্জুর।
সুদহার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আশা দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। আর মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামলেই নীতি সুদহার কমিয়ে ঋণ ও আমানতের সুদহারের কাঠামো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
গভর্নর বলেন, আমাদের ইনফ্লেশনটা যখন কমে যাবে ৮ বা সাড়ে ৭-এ এবং সেটার সাথে কিন্তু ফুল স্ট্রাকচারটা (সুদ হারের) সিঙ্গেল ডিজিট নেমে আসতে পারে। তো এইটার জন্য আমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। হঠাৎ করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভলি কিছু করাটা খুব মারাত্মক পলিসি রিভার্সাল হয়ে যাবে এবং সেটা করাটা উচিত নয় একেবারে। দরকার হলে ছয় মাস ওয়েট করব আমরা কিন্তু টেকসইভাবে এটাকে আমরা নামিয়ে আনব।
বছর কয়েক ধরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উঠেছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে। উচ্চ এ হার পরের মাসগুলোতেও বজায় ছিল। মূল্যস্ফীতির হারে লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে থেকেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে আসছিল। সরকার বদলের পর দায়িত্বে আসা নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও তা অব্যাহত রাখেন; টানা বাড়ানো হয় নীতি সুদহার।
অন্য দেশের সুদের হারের সঙ্গে তাদের মূল্যস্ফীতিও আমলে নেওয়ার তাগিদ দিয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের ইনফ্লেশন টার্গেট আমরা যদি ভারতের সাথে তুলনা করি, চায়নার সাথে তুলনা করি অন্য দেশের সাথে করি; তাদের ইনফ্লেশনটা কতখানি? ৩, ৪, ১, ০ বা নেগেটিভ। চায়নাতে নেগেটিভ। জাপানে নেগেটিভ হয়, মাঝে মাঝে একটু পজিটিভ হয়। ভারতে হচ্ছে ২ থেকে ৩ শতাংশের মতো। আমাদের এখনো ৮। এইখানে আমাকে কাজ করতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমার হাই ইনফ্লেশন থাকবে, ইন্টারেস্ট রেট কম থাকবে-হতে পারে না। কারণ প্রকৃত মূল্যস্ফীতিটাকে আমাকে দেখতে হবে। আমাকে কিন্তু দেখতে হবে যে, বাংলাদেশের রিয়াল ইন্টারেস্ট রেটটা। এখন একটু রিয়েল হয়েছে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এটা রিয়াল নেগেটিভ ছিল। কাজেই এখানে কিন্তু আমাদের একটা কোয়ালিটেটিভ শিফট আনতে হয়েছে এবং সেটা আনার কারণেই কিন্তু মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশনটা হচ্ছে। এটাকে আমার ধরে রাখতে হবে।
রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক দিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদ হারকে বলা হয় নীতি সুদ হার (পলিসি রেট)। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়।
আমানত বা ঋণের অবস্থা যাই হোক, এভাবে নীতি সুদহার ধরে রাখার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, এতে করে এখন মুদ্রার বিনিময় হার বাজারে স্থিতিশীল হয়েছে। আমি আশা করব যে, অর্থবছরের শেষ নাগাদ ইনফ্লেশন পাঁচের নিচেই যাবে। আমি আগে থেকেও বলছি সেটা এবং এটা আমরা নিতে পারব আশাবাদী।
বর্তমান সরকারের নীতি যাতে পরবর্তী সরকার অনুসরণ করে, সেই আহ্বান জানিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, তার মাধ্যমে আমরা মূল্যস্ফীতিকে ৫ বা ৪-এ নিয়ে আসতে পারব; ৩-এ নিয়ে আসতে পারব।
খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
গভর্নর বলেন, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় সম্পদ। কোনো ব্যক্তির জন্য আমরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারি না। এগুলো মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। তবে আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইনের প্রয়োগ হবে, ব্যক্তিকে আমরা ছাড়ব না। এই নীতি ছিল আমাদের। এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি।
খেলাপি ঋণ আদায় করতে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে ৭০ হাজার কোটি টাকা দরকার। যেটা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। আগামী অর্থ বছরের বাজেট থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।
দেশে প্রচুর ‘লিলিপুট’ ব্যাংক রয়েছে উল্লেখ করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের একটি ব্যাংকও নেই। এটা আগামী ২০ বছরেও সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করলে ১০-১৫ বছরে ব্র্যাক ব্যাংক হয়তো সেখানে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন না, তারাই মূলত এ দেশে বড়লোক। তবে উপদেষ্টার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, টাকা পাচার ও বিত্তবান হওয়ার দৌড়ে কেবল ব্যবসায়ীরা নন, আমলারাও জড়িত।
উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান দেশের বেসরকারি খাতের বিকাশকে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (স্বজনতোষী পুঁজিবাদ) হিসেবে অভিহিত করে বলেন, আমাদের দেশের বেসরকারি খাত ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে-যে আপনার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক থাকে। আমাদের দেশে বড়লোক কারা? যারা ব্যাংকের ঋণ নিয়ে দেয় না। সম্পদশালী কারা? যারা গ্যাস বিল দেয় না, বিদ্যুৎ বিল দেয় না।
তবে এই পরিস্থিতির জন্য তিনি এককভাবে ব্যবসায়ীদের দায়ী করতে চাননি। তিনি বলেন, ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের জন্য আমি বেসরকারি খাতকে দোষ দেব না, আপনাদের দোষ দিতে চাই না—সিস্টেমই ছিল এমন।
উপদেষ্টা আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা মূলত পণ্য উৎপাদন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমেই সম্পদ গড়ে তোলেন। বেসরকারি খাতের জন্য আরও সুযোগ উন্মুক্ত করে দেবে সরকার।

জনপ্রিয়

খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব

ব্যবসায়ীরা হতাশ, আশা দেখালেন গভর্নর

প্রকাশ : ১২:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহার যে পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা হতাশ। তবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আশা দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বিনিয়োগ সংলাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়ে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী নেতা ও শিল্প উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

সংলাপে এপেক্স গ্রুপের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আপনার (গভর্নর) কাছে একটা বিনীত নিবেদন, বিজনেস পিপলরা এই ইন্টারেস্ট সইতে পারছি না। আমাদের জন্য ইমপসিবল হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্যার, আমরা সুদের হারের বিপক্ষে না। তবে এখন ব্যবসা করা ভেরি ভেরি ডিফিকাল্ট এবং এই ইন্টারেস্ট রেটটা কীভাবে কমানো যায়। বিশেষ করে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দুটো দেশ বেঞ্চমার্ক। ভিয়েতনাম এবং ইন্ডিয়া- তাদের সাথে আমরা পারছি না। এই কস্ট অব ক্যাপিটাল ফর ম্যানুফ্যাকচারিং লং টার্ম, শর্ট টার্ম কীভাবে কমানো যায়।
নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘অগ্রিম কর ও উৎসে কর হচ্ছে কর-সন্ত্রাস (ট্যাক্স টেররিজম)। এটা বন্ধ করতে হবে। আমরা লাভ করি বা লোকসান করি-সব অবস্থাতেই আমরা কর দিয়ে যাচ্ছি। এমনও হয়েছে যে লোকসান করেছি বেশি, আবার করও বেশি দিয়েছি। এই অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআর বিভিন্ন সংস্কার ইতিমধ্যে করেছে। তাতে বন্ড অটোমেশন হয়েছে ও এইচএস কোডের যে “টেররিজম” ছিল, সেখানে থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। এখন অগ্রিম কর ও উৎসে কর থেকে মুক্তি চাই।’
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু ব্যবসায়ীরা বিত্তবান হয়েছে, নাকি আমলারাও হয়েছেন-এই কথাটা বলা হয় না। যে টাকা পাচার করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার করেছেন আমলারা। আমরা ব্যবসায়ীরা এ দায় নিতে চাই না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা টাকা চুরি করেন, গ্যাস চুরি করেন, তাঁদের ধরেন, আইনের আওতায় আনেন। ওনাদের দায় যেন আমাদের ওপরে না আসে।’
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো বিদেশি অংশীদারদের কথা শুনে চলা ব্যবসায়ীরা সমর্থন করে না বলে মন্তব্য করেন নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘আপনাদের চার বিলিয়ন, পাঁচ বিলিয়ন—যে অর্থ লাগবে, আমরা রপ্তানি থেকে এনে দেব। কিন্তু তাদের সব জায়গায় অনুসরণ করা উচিত হবে না।’
এ ছাড়া রপ্তানিতে ইডিএফ তহবিল পুনরায় চালু করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করা, ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধান করার অনুরোধ জানান নাসিম মঞ্জুর।
সুদহার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আশা দেখিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। আর মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামলেই নীতি সুদহার কমিয়ে ঋণ ও আমানতের সুদহারের কাঠামো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
গভর্নর বলেন, আমাদের ইনফ্লেশনটা যখন কমে যাবে ৮ বা সাড়ে ৭-এ এবং সেটার সাথে কিন্তু ফুল স্ট্রাকচারটা (সুদ হারের) সিঙ্গেল ডিজিট নেমে আসতে পারে। তো এইটার জন্য আমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। হঠাৎ করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভলি কিছু করাটা খুব মারাত্মক পলিসি রিভার্সাল হয়ে যাবে এবং সেটা করাটা উচিত নয় একেবারে। দরকার হলে ছয় মাস ওয়েট করব আমরা কিন্তু টেকসইভাবে এটাকে আমরা নামিয়ে আনব।
বছর কয়েক ধরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উঠেছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে। উচ্চ এ হার পরের মাসগুলোতেও বজায় ছিল। মূল্যস্ফীতির হারে লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে থেকেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে আসছিল। সরকার বদলের পর দায়িত্বে আসা নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও তা অব্যাহত রাখেন; টানা বাড়ানো হয় নীতি সুদহার।
অন্য দেশের সুদের হারের সঙ্গে তাদের মূল্যস্ফীতিও আমলে নেওয়ার তাগিদ দিয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের ইনফ্লেশন টার্গেট আমরা যদি ভারতের সাথে তুলনা করি, চায়নার সাথে তুলনা করি অন্য দেশের সাথে করি; তাদের ইনফ্লেশনটা কতখানি? ৩, ৪, ১, ০ বা নেগেটিভ। চায়নাতে নেগেটিভ। জাপানে নেগেটিভ হয়, মাঝে মাঝে একটু পজিটিভ হয়। ভারতে হচ্ছে ২ থেকে ৩ শতাংশের মতো। আমাদের এখনো ৮। এইখানে আমাকে কাজ করতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমার হাই ইনফ্লেশন থাকবে, ইন্টারেস্ট রেট কম থাকবে-হতে পারে না। কারণ প্রকৃত মূল্যস্ফীতিটাকে আমাকে দেখতে হবে। আমাকে কিন্তু দেখতে হবে যে, বাংলাদেশের রিয়াল ইন্টারেস্ট রেটটা। এখন একটু রিয়েল হয়েছে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এটা রিয়াল নেগেটিভ ছিল। কাজেই এখানে কিন্তু আমাদের একটা কোয়ালিটেটিভ শিফট আনতে হয়েছে এবং সেটা আনার কারণেই কিন্তু মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশনটা হচ্ছে। এটাকে আমার ধরে রাখতে হবে।
রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক দিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদ হারকে বলা হয় নীতি সুদ হার (পলিসি রেট)। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়।
আমানত বা ঋণের অবস্থা যাই হোক, এভাবে নীতি সুদহার ধরে রাখার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, এতে করে এখন মুদ্রার বিনিময় হার বাজারে স্থিতিশীল হয়েছে। আমি আশা করব যে, অর্থবছরের শেষ নাগাদ ইনফ্লেশন পাঁচের নিচেই যাবে। আমি আগে থেকেও বলছি সেটা এবং এটা আমরা নিতে পারব আশাবাদী।
বর্তমান সরকারের নীতি যাতে পরবর্তী সরকার অনুসরণ করে, সেই আহ্বান জানিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, তার মাধ্যমে আমরা মূল্যস্ফীতিকে ৫ বা ৪-এ নিয়ে আসতে পারব; ৩-এ নিয়ে আসতে পারব।
খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
গভর্নর বলেন, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় সম্পদ। কোনো ব্যক্তির জন্য আমরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারি না। এগুলো মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। তবে আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইনের প্রয়োগ হবে, ব্যক্তিকে আমরা ছাড়ব না। এই নীতি ছিল আমাদের। এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি।
খেলাপি ঋণ আদায় করতে অর্থ ঋণ আইনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে ৭০ হাজার কোটি টাকা দরকার। যেটা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। আগামী অর্থ বছরের বাজেট থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।
দেশে প্রচুর ‘লিলিপুট’ ব্যাংক রয়েছে উল্লেখ করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের একটি ব্যাংকও নেই। এটা আগামী ২০ বছরেও সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করলে ১০-১৫ বছরে ব্র্যাক ব্যাংক হয়তো সেখানে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন না, তারাই মূলত এ দেশে বড়লোক। তবে উপদেষ্টার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, টাকা পাচার ও বিত্তবান হওয়ার দৌড়ে কেবল ব্যবসায়ীরা নন, আমলারাও জড়িত।
উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান দেশের বেসরকারি খাতের বিকাশকে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (স্বজনতোষী পুঁজিবাদ) হিসেবে অভিহিত করে বলেন, আমাদের দেশের বেসরকারি খাত ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে-যে আপনার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক থাকে। আমাদের দেশে বড়লোক কারা? যারা ব্যাংকের ঋণ নিয়ে দেয় না। সম্পদশালী কারা? যারা গ্যাস বিল দেয় না, বিদ্যুৎ বিল দেয় না।
তবে এই পরিস্থিতির জন্য তিনি এককভাবে ব্যবসায়ীদের দায়ী করতে চাননি। তিনি বলেন, ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের জন্য আমি বেসরকারি খাতকে দোষ দেব না, আপনাদের দোষ দিতে চাই না—সিস্টেমই ছিল এমন।
উপদেষ্টা আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা মূলত পণ্য উৎপাদন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমেই সম্পদ গড়ে তোলেন। বেসরকারি খাতের জন্য আরও সুযোগ উন্মুক্ত করে দেবে সরকার।