রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়ে হত্যার রহস্য দ্রুত উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতার গৃহকর্মী আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
মোহাম্মদপুর শাহজাহান রোডের এই ঘটনায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা হত্যার দায় স্বীকার করে জানায়, ওই বাসায় কাজে যোগ দেয়ার দ্বিতীয় দিন সে ২ হাজার টাকা চুরি করে। তৃতীয় দিন টাকার ব্যাপারে গৃহকর্ত্রী জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় সঙ্গে তার তর্ক হয়। চতুর্থ দিন ওই সুইচ গিয়ার চাকু লুকিয়ে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে গৃহকর্মী আয়েশা। এদিনও টাকা চুরির বিষয়টি নিয়ে গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে তর্ক হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে গৃহকর্ত্রী আফরোজা তার স্বামীকে ফোন দেয়ার চেষ্টা করলে পেছন থেকে ছুরি মারে আয়েশা। এই সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে গৃহকর্ত্রীকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে গৃহকর্মী।
ঘটনার সময় মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে ওঠা নাফিসা বাঁচাতে এগিয়ে আসলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে গৃহকর্মী। নাফিসা ইন্টারকমে গার্ডকে ফোন দিতে চাইলে আয়েশা ইন্টারকমের মূল তার ছিঁড়ে ফেলে। আয়েশার ছুরিকাঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুজনেরই মৃত্যু হয়।’
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৬০ ঘণ্টার মাথায় মূল আসামি গৃহকর্মী আয়েশাকে স্বামীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার অতীতের বিভিন্ন মামলা ও জিডির তথ্য বিশ্লেষণ করে আয়েশাকে শনাক্ত করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৮ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ৫১ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের ভেতরে মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ৩ দিন আগে কাজে যোগ দেয়া গৃহকর্মী ‘আয়েশা’কে দায়ী করে হত্যা মামলা করেন নিহতের স্বামী আজিজুল ইসলাম (৫৭)। আয়েশাকে সন্দেহ করা হলেও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—গৃহকর্মী আয়েশার কোনো ছবি, এনআইডি, মোবাইল নম্বর বা পরিচয় সংরক্ষিত না থাকা। সিসিটিভির ফুটেজেও তাকে চেনার মতো কোনো স্পষ্ট ভিজ্যুয়াল পাওয়া যায়নি, কারণ সে প্রতিবারই বোরকা পরে, মুখ ঢেকে আসা–যাওয়া করত।’
তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার আশপাশে কোনো ডিজিটাল ক্লু না পেয়ে তদন্ত দল ‘ম্যানুয়াল’ উপায়ে থানায় গত এক বছরে গৃহকর্মী কর্তৃক সংঘটিত চুরির ঘটনাগুলো খুঁজতে থাকে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন—গলায় পোড়া দাগ, জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় বাস, গৃহকর্মী পরিচয়ে সংঘটিত পূর্বের চুরি তথ্য নিয়ে মাঠে নামে তদন্তকারীরা। এখানেও আয়েশার তথ্য মিলে যায়। হুমায়ুন রোডে সেই ভুক্তভোগী পরিবার থেকে একটি পুরনো মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়, যা থেকেই শুরু হয় আসামির সন্ধান। সিডিআরের বিশ্লেষণে পাওয়া অবস্থান ধরে হেমায়েতপুরে গিয়ে জানা যায়—নম্বরটি ব্যবহার করত রাব্বি নামের এক ব্যক্তি। তদন্তে বেরিয়ে আসে—রাব্বির স্ত্রীই হলো সেই আয়েশা এবং তারা পূর্বে জেনেভা ক্যাম্পে থাকত—বাদীর দেয়া বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। পরবর্তীতে হেমায়েতপুরে অভিযান চালানো হলে দরজা তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে পরিবারের সদস্যদের তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। অবশেষে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার চরকায়া গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আয়েশা ও তার স্বামী রাব্বিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় আয়েশার কাছ থেকে একটি চুরি করা ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।’’
ডিএমপির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নিজের রক্তমাখা কাপড় বদল করে। এরপর নাফিসার স্কুল ড্রেসে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এই সময়ে ব্যাকপ্যাকে ল্যাপটপ–ফোন নিয়ে যায়। এরপর সে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে তার পরিহিত পোশাক পরিবর্তন করে। পরবর্তীতে ঢাকা ছাড়ার সময়ে সিংগাইর ব্রিজ থেকে ফোন ও পোশাক ভর্তি ব্যাগ নদীতে ফেলে দেয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল বলেন, ‘আয়েশার আগে থেকেই চুরির স্বভাব রয়েছে। এমনকি নিজের বোনের বাড়ি থেকেও ২ লাখ টাকা ও ৪ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করেছিল। এর আগে হুমায়ুন রোডে চুরির ঘটনায় থানা পুলিশ তাকে আটক করেছিলো।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘ঢাকাবাসীর উদ্দেশে ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে অনুরোধ আপনারা যারা বাসায় গৃহকর্মী রাখেন তারা তাদের পরিচয় নিশ্চিত হবেন। আপনার বাসায় কাজ করা ব্যক্তির পরিচয়পত্র ও তাকে শনাক্তকারী ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে রাখবেন। কারণ আপনি বাসার গৃহকর্মীর বানানো খাবার খান, আপনার বেড রুমে গৃহকর্মী প্রবেশ করে। এখানে আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জড়িত।’
এদিকে মা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আর তাঁর স্বামী রাব্বি শিকদারের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। বৃহস্পতিবার শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম এই আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাইয়ূম হোসাইন নয়ন জানান, আসামিদের আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সহিদুল ওসমান মাসুম। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করে। আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। শুনানি শেষে আদালত আয়েশার ৬ দিন, তাঁর স্বামী রাব্বির ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দেশ প্রতিবেদক 









