জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি। শনিবার বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। এরমধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদ বিরোধী এক বিপ্লবী রাজকীয় বিদায় নিলেন।
ওসমান হাদিকে কবরে শোয়ানোর পর মাটি দিয়ে কান্না ভেঙে পড়লেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। হাসনাতকে দেখা যায় কবরে মাটি দেওয়ার সময় তিনি বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে পাশের একোটি ইটের দেয়ালে বসে পড়লেন। কান্নার কারণে তিনি কথাই বলতে পারছিলেন না।
এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শরিফ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ২টার আগে ওসমান হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স জানাজাস্থলে নিয়ে আসা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসেএতে অংশ নেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ ও আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার আগে হাদির জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। বক্তব্য রাখেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। এরপর বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আবেগপ্রবণ বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, ‘প্রিয় হাদি, আমরা তোমাকে ভুলব না। কেউ তোমাকে ভুলবে না। আজ তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি। তুমি যে মন্ত্র রেখে গেছ, সেটাকে ধারণ করে আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার লড়াই চালিয়ে যাব। তোমার দেখানো পথে সবাই আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। কেউ তোমাকে ভুলবে না, বরং তোমার মন্ত্র বয়ে নিয়ে যাবে।’
বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এই সম্মুখভাগের যোদ্ধার। জানাজার আগে তিনি এক আবগঘন বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি জাতির কাছে একটা প্রশ্ন রাখেন।
আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘ওসমান হাদির সন্তানের এখন ৮ মাস বয়স। সন্তান হওয়ার পর সে আমাকে বলে, ভাই আমার সন্তানের জন্য একটা নাম নির্বাচন করেন, যেই নামের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা থাকবে। যে নাম সাহসিকতার পরিচয় বহন করবে। ওর সন্তানের নাম দিয়েছেলাম ফিরনাস অর্থাৎ বিপ্লবী এবং সাহসী। আজ ওর সন্তানের দিকে তাকানো যায় না। আমার মা প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল শরীফ ওসমান বিন হাদি। আজকে তার লাশ আমার কাঁধে বহন করতে হচ্ছে। আজ আপনাদের কাছে আমার কোনো দাবি নেই, শুধু একটিই দাবি ৭ থেকে ৮ দিন হয়ে গেল, প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানী ঢাকায় খুনি প্রকাশ্যে গুলি করে যদি পার পেয়ে যায় এর থেকে লজ্জার আমাদের কাছে আর কিছুই নেই। যদি বর্ডার ক্রস হয়ে যায়, ৫-৭ ঘণ্টা সময় তারা কেমন করে গেল এই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখে গেলাম।’
এতে আরও অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও গণঅধিকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। জানাজায় যোগ দেন সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান।

জানাজায় অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মানিক মিয়া এভিনিউতে আসেত থাকেন। নিরাপত্তা আর্চওয়ে গেট দিয়ে ছাত্র-জনতা দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশ করেন। জানাজা ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের দক্ষিণাংশের দুটো মাঠ ও আশপাশের এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য।
হাদির জানাজা নামাজে অংশ নিতে এসে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আল্লাহ শরিফ ওসমান হাদি ভাইকে কবুল করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বার্ভভৌমত্বের জন্য। বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে এই বাংলাদেশকে যেন আমরা নিজেদের মতো করে পরিচালনা করতে পারি। আমাদের দেশকে যেন আমরা বিদেশি নানা ধরনের আগ্রাসন, বিশেষ করে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত করতে পারি। এই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা বিরাজমন থাকে এবং ওসমান হাদি ভাই যে সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করেছিলেন, সে সাংস্কৃতিক লড়াইকে যেন আমরা পরিপূর্ণ করতে পারি। সে দোয়াই আমরা করব। তার পরিবারের জন্য আমরা দোয়া করি।
হাদির জানাজায় অংশ নেন লক্ষাধিক মানুষ। হাদিকে হারিয়ে তারা কাঁদছিলেন। কারো ছিল চোখে জল, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। অনেকেই চোখের জল আড়াল করতে গিয়েও পারেননি। অশ্রুসিক্ত চোখে হাদিকে বিদায় জানাল লাখো জনতা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফার্মগেট, আসাদ গেট হয়ে দলে দলে মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঢুকছেন। কেউ হাতে, কেউ মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের মাঠে লোকজন জড়ো হয়েছেন। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁরা নানা স্লোগান দিচ্ছেন।
ওসমান হাদির জানাজা উপলক্ষে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের প্রবেশপথগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষকে কয়েক স্তরে তল্লাশি করে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব, আনসার মোতায়েন করা হয়েছে । সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও টহল দিতে দেখা যায়।
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জানাজা উপলক্ষে এক হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরাসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদির ওপর আক্রমণ করা হয়। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে এসে দুজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।
মাহমুদুল করিম খান 









