ঢাকা ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবর্ধনায় সিক্ত তারেক রহমান

নির্বাসন শেষে রাজসিক প্রত্যাবর্তন

  • মাহমুদুল করিম খান
  • প্রকাশ : ০৩:২১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ১৭ বছর পর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে রাজসিক সংবর্ধনায় সিক্ত হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংবর্ধনার পর তিনি দেশবাসী উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘‘দেশ গড়তে, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’।’’
তিনি বলেন, ‘‘আপনারা মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম শুনেছেন তো? তিনি বলেছিলেন, আই হ্যাভ এ ড্রিম। আমি আপনাদের সামনে বলতে চাই, দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নে এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আপনারা যদি পাশে থাকেন এবং আমাদের সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নিরাপদ একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।”
বৃহস্পতিবার তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে রাজধানীর তিনশ ফিট এলাকার জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। ওই সময় সংবর্ধনা স্থল লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। লাখ লাখ লোকের সমাগম হয় সেখানে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সরাসরি তিনি চলে যান সংবর্ধনা স্থলে।
তিনি দেশে পৌঁছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ফোনে কথা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে।
বক্তব্যে তারেক রহমান আরো বলেন, ‘কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দল-মত নির্বিশেষে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব র¶ায় নিজেদের অবদান রেখেছিল। দেশবাসী আবার তাদের কথা বলা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা চায় যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় এসেছে। সবাই মিলে আমাদের দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ি মানুষ রয়েছে, ঠিক তেমনি সমতলের মানুষও আছে। মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে বাস করে। আমরা চাই, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা স্বপ্ন দেখেন একজন মা। আমরা চাই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ, যেখানে নারী, পুরুষ, শিশু- যে কেউ হোক না কেন- নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারবে এবং নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে।’
তারেক রহমান আরো বলেন, ‘এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, প্রায় পাঁচ কোটির মতো শিশু, ৪০ লাখের মতো প্রতিবন্ধী, কয়েক কোটি কৃষক ও শ্রমিক রয়েছেন। এসব মানুষের রাষ্ট্র থেকে একটি প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লাখো-কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হব।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমাদের শহীদরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অসংখ্য মানুষÑ শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরপরাধ মানুষও- গুম ও হত্যার শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমাদের তরুণ প্রজন্ম জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়।’
তিনি বলেন, ‘২৪-এর আন্দোলনের একজন সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন, এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হোক এবং মানুষ তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার ফিরে পাক। ২৪-এর আন্দোলন ও শহীদ ওসমান হাদিসহ ৭১ সালের শহীদরা এবং বিগত স্বৈরাচারের সময় নানা অত্যাচারের শিকারদের কাছে তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার দায়িত্ব রয়েছে। আমরা সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো যেখানে সবাই মিলে কাজ করব এবং দেশকে দৃঢ়ভিত্তিতে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
সবকিছু বাস্তবায়নে মহান আল্লাহর রহমত কামনা ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা অনুসরণ করার কথা বলেন তারেক রহমান।
বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা: এর আগে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন পার করে ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন তারেক রহমান। সেখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অভ্যর্থনা জানান। তার সফরসঙ্গী ছিলেন, সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, দলের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান সানি। বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে গ্রহণ করেন শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু।
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সংবর্ধনা স্থলে: দলের প্রিয় নেতাকে সংবর্ধনা দিতে বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলমুখী তিনশ ফিট সড়কের একটি অংশজুড়ে মঞ্চ তৈরি করে বিএনপি। ৪৮ ফুট দীর্ঘ, ৩৬ ফুট প্রশস্ত ও সড়ক থেকে আট ফুট উঁচুতে এ মঞ্চ। প্রায় ৯০০ মাইক লাগানো হয় রাজধানীতে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে আবদুল্লাহপুর, বিশ্বরোড, বনানী হয়ে মহাখালী, যমুনা ফিউচার পার্ক, ৩০০ ফিটের রাস্তা ধরে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত লাগানো হয় এসব মাইক। পুরো এলাকা সিসি টিভির নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রায় বিকাল ৪টার দিতে তিনি সংবর্ধনা স্থলে পৌঁছেন।
বিমানবন্দরে কড়া নিরাপত্তা ও যানবাহন:তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে কেনা বুলেটপ্রুফ গাড়ি বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেল গাড়ি ছিল সঙ্গে।
তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় সংবর্ধনা স্থলে যান। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে কাছে ভিড়তে দেয়নি পুলিশ। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও ছদ্মবেশে গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট-এই তিন জোনে ভাগ করে সাজানো হয় নিরাপত্তার ছক।
সংবর্ধনা শেষে মাকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে: সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান রওনা দেন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের দিকে। সেখানে তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভর্তি রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে হাসপাতাল থেকে বের হন তারেক রহমান। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন। এর আগে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় আসেন তারেক রহমান। পরে ৫টা ৫৪ মিনিটের দিকে তিনি হাসপাতালে প্রবেশ করেন। এভারকেয়ার থেকে তিনি গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায় উঠেন। এর আগে এয়ারপোর্ট থেকে তার স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান সরাসরি ওই বাসায় যান।
লন্ডন থেকে যাত্রা: তারেক রহমান ২৪ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১৫ মিনিট)লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারে ঢাকা আসার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ যাত্রাপথে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঘণ্টা বিরতিতে থাকে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি।
আজ ও কালকের কর্মসূচি: বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি তারেক রহমানের দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
যার মধ্যে রয়েছে, শুক্রবার ও শনিবার তারেক রহমানের কর্মসূচি রয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে যাবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন তিনি।
পরদিন শনিবার ভোটার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যাবেন নির্বাচন ভবনে এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন পঙ্গু হাসপাতালে। সেদিন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতেও যাবেন তারেক রহমান।
কবে দেশ ছেড়েছিলেন:২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তারেক রহমান প্রায় ১৮ মাস কারাভোগ করেন। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সপরিবারে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে চিকিৎসার জন্য গেলেও পরবর্তীতে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে তার নামে একটার পর একটা মামলা দেওয়া হয়।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর পবিবর্তিত প্রেক্ষাপটের পর তিনি এখন দেশে ফিরলেন।

জনপ্রিয়

সংবর্ধনায় সিক্ত তারেক রহমান

নির্বাসন শেষে রাজসিক প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ : ০৩:২১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫

দীর্ঘ ১৭ বছর পর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে রাজসিক সংবর্ধনায় সিক্ত হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংবর্ধনার পর তিনি দেশবাসী উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘‘দেশ গড়তে, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’।’’
তিনি বলেন, ‘‘আপনারা মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম শুনেছেন তো? তিনি বলেছিলেন, আই হ্যাভ এ ড্রিম। আমি আপনাদের সামনে বলতে চাই, দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নে এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আপনারা যদি পাশে থাকেন এবং আমাদের সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নিরাপদ একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।”
বৃহস্পতিবার তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে রাজধানীর তিনশ ফিট এলাকার জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। ওই সময় সংবর্ধনা স্থল লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। লাখ লাখ লোকের সমাগম হয় সেখানে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সরাসরি তিনি চলে যান সংবর্ধনা স্থলে।
তিনি দেশে পৌঁছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ফোনে কথা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে।
বক্তব্যে তারেক রহমান আরো বলেন, ‘কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দল-মত নির্বিশেষে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব র¶ায় নিজেদের অবদান রেখেছিল। দেশবাসী আবার তাদের কথা বলা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা চায় যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় এসেছে। সবাই মিলে আমাদের দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ি মানুষ রয়েছে, ঠিক তেমনি সমতলের মানুষও আছে। মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে বাস করে। আমরা চাই, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা স্বপ্ন দেখেন একজন মা। আমরা চাই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ, যেখানে নারী, পুরুষ, শিশু- যে কেউ হোক না কেন- নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারবে এবং নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে।’
তারেক রহমান আরো বলেন, ‘এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, প্রায় পাঁচ কোটির মতো শিশু, ৪০ লাখের মতো প্রতিবন্ধী, কয়েক কোটি কৃষক ও শ্রমিক রয়েছেন। এসব মানুষের রাষ্ট্র থেকে একটি প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লাখো-কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হব।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমাদের শহীদরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অসংখ্য মানুষÑ শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরপরাধ মানুষও- গুম ও হত্যার শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমাদের তরুণ প্রজন্ম জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়।’
তিনি বলেন, ‘২৪-এর আন্দোলনের একজন সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন, এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হোক এবং মানুষ তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার ফিরে পাক। ২৪-এর আন্দোলন ও শহীদ ওসমান হাদিসহ ৭১ সালের শহীদরা এবং বিগত স্বৈরাচারের সময় নানা অত্যাচারের শিকারদের কাছে তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার দায়িত্ব রয়েছে। আমরা সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো যেখানে সবাই মিলে কাজ করব এবং দেশকে দৃঢ়ভিত্তিতে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
সবকিছু বাস্তবায়নে মহান আল্লাহর রহমত কামনা ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা অনুসরণ করার কথা বলেন তারেক রহমান।
বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা: এর আগে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন পার করে ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন তারেক রহমান। সেখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অভ্যর্থনা জানান। তার সফরসঙ্গী ছিলেন, সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, দলের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান সানি। বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে গ্রহণ করেন শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু।
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সংবর্ধনা স্থলে: দলের প্রিয় নেতাকে সংবর্ধনা দিতে বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলমুখী তিনশ ফিট সড়কের একটি অংশজুড়ে মঞ্চ তৈরি করে বিএনপি। ৪৮ ফুট দীর্ঘ, ৩৬ ফুট প্রশস্ত ও সড়ক থেকে আট ফুট উঁচুতে এ মঞ্চ। প্রায় ৯০০ মাইক লাগানো হয় রাজধানীতে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে আবদুল্লাহপুর, বিশ্বরোড, বনানী হয়ে মহাখালী, যমুনা ফিউচার পার্ক, ৩০০ ফিটের রাস্তা ধরে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত লাগানো হয় এসব মাইক। পুরো এলাকা সিসি টিভির নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রায় বিকাল ৪টার দিতে তিনি সংবর্ধনা স্থলে পৌঁছেন।
বিমানবন্দরে কড়া নিরাপত্তা ও যানবাহন:তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে কেনা বুলেটপ্রুফ গাড়ি বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেল গাড়ি ছিল সঙ্গে।
তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় সংবর্ধনা স্থলে যান। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে কাছে ভিড়তে দেয়নি পুলিশ। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও ছদ্মবেশে গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট-এই তিন জোনে ভাগ করে সাজানো হয় নিরাপত্তার ছক।
সংবর্ধনা শেষে মাকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে: সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান রওনা দেন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের দিকে। সেখানে তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভর্তি রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে হাসপাতাল থেকে বের হন তারেক রহমান। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন। এর আগে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় আসেন তারেক রহমান। পরে ৫টা ৫৪ মিনিটের দিকে তিনি হাসপাতালে প্রবেশ করেন। এভারকেয়ার থেকে তিনি গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায় উঠেন। এর আগে এয়ারপোর্ট থেকে তার স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান সরাসরি ওই বাসায় যান।
লন্ডন থেকে যাত্রা: তারেক রহমান ২৪ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১৫ মিনিট)লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারে ঢাকা আসার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ যাত্রাপথে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঘণ্টা বিরতিতে থাকে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি।
আজ ও কালকের কর্মসূচি: বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি তারেক রহমানের দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
যার মধ্যে রয়েছে, শুক্রবার ও শনিবার তারেক রহমানের কর্মসূচি রয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে যাবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন তিনি।
পরদিন শনিবার ভোটার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যাবেন নির্বাচন ভবনে এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন পঙ্গু হাসপাতালে। সেদিন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতেও যাবেন তারেক রহমান।
কবে দেশ ছেড়েছিলেন:২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তারেক রহমান প্রায় ১৮ মাস কারাভোগ করেন। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সপরিবারে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে চিকিৎসার জন্য গেলেও পরবর্তীতে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে তার নামে একটার পর একটা মামলা দেওয়া হয়।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর পবিবর্তিত প্রেক্ষাপটের পর তিনি এখন দেশে ফিরলেন।