রাজধানীসহ সারা দেশে জেঁকে বসেছে শীত। পৌষ মাসের প্রথমার্ধে উত্তুরে হাওয়া ও কুয়াশার সঙ্গে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বাড়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।
বৃহস্পতিবার সকালে দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এ সময় বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৮৯ শতাংশ। যা গত কয়েকদিনের তুলনায় বেশি শীতল আবহাওয়া তৈরি করেছে।
এদিন সকাল থেকেই হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল রাজধানী। বেলা বাড়লেও শীতল বাতাসের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে কর্মস্থলে যাওয়া মানুষকে ভারী শীতবস্ত্র পরে বাইরে বের হতে দেখা যায়।
ঢাকার কারওয়ানবাজার এলাকায় অফিসগামী সজিব আহমেদ জানান, ডিসেম্বরের শুরুতে মনে হয়নি এবার এত শীত পড়বে। শেষ দিকে এসে যে শৈত্যপ্রবাহ পড়েছে, তাতে অফিসগামীরা কিছুটা দুর্ভোগে পড়েছেন। শীতের এই তীব্রতা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিশেষ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেক অফিসগামী মনির হোসেন জানান, উত্তরা থেকে কারওয়ানবাজার আসার পুরো পথেই দেখা গেছে কুয়াশা। পথে যান চলাচলও অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। রাস্তার পাশে আগুন ধরিয়ে ছিন্নমূলদের শীত নিবারণের চিত্রও চোখে পড়েছে বলে তিনি জানান।
শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা ঢাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। গতকাল রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সৈয়দপুরে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুরে ১১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
উত্তরের জেলাগুলোতে জেঁকে বসেছে হাড় কাঁপানো শীত। হিম শীতল বাতাসের সঙ্গে দেখা দিয়েছে কুয়াশার দাপট। কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ভোর নামতেই কুয়াশার ঘনত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাস্তা, মাঠ ও বসতবাড়ি ঢেকে যায় সাদা কুয়াশার চাদরে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও খোলা প্রান্তরের মানুষ। টিনের চালা ঘর, ফাঁকা দেয়াল আর কয়েক টুকরো পুরোনো কাপড়ই তাদের শীত নিবারণের একমাত্র ভরসা। গভীর রাতে ঘন কুয়াশা শিশিরের মতো নয়, যেন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে-ভিজে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও কাপড়চোপড়।
রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. মেশকাতুল আবেদ জানান, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এই চিকিৎসক।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালের ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ৪০টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১৭৮ শিশু ভর্তি রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এক একটি শয্যায় চার থেকে পাঁচজন শিশুকে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গত সাত দিনে এই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেই ভর্তি হয়েছে ৬১৩ জন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, বেড সংকটের কারণে এই ভোগান্তি হচ্ছে। রংপুরে নতুন একটি শিশু হাসপাতাল চালুর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে এই চাপ কমবে।
লালমনিরহাটের সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলাজুড়ে শীতল বাতাসের সঙ্গে দেখা দিয়েছে কুয়াশার দাপট। দিনের বেলাতেও সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে। এতে ভোরে কাজে বের হওয়া দিনমজুর, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
কালীগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পাশে অটোরিকশা চালক এনামুল হক বলেন, সকাল হইলেই শরীর নড়ে না। তাও গাড়ি নিয়ে বাহির হইতে হয়। কাজ না করলে খাওন জুটে না। তীব্র শীতেও গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি, যাত্রী একবারে কম।
নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের কষ্ট আরও বেশি। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা আজিজার মিয়া বলেন, এতো ঠান্ডায় হাত-পা শক্ত হইয়া যায়। রাইতে ঠিকমতো ঘুম আইসে না। নদী পাড়ের মানুষ বড় কষ্টে আছি।
শীতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রোগবালাইও। জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। তবে দরিদ্র পরিবারের অনেকেরই প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ নেই।
হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আজমল হক বলেন, শীতকালে শিশু ও বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে শীতের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলছে। টানা চার দিন ধরে জেলার তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে অবস্থান করছে।
বৃহস্পতিবার ভোর ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ১০০ শতাংশ। কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি আরও জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে তাপমাত্রা আরও কমে শৈত্যপ্রবাহের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আগের দিন বুধবার জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মঙ্গলবার ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে পুরো জেলা। হিমেল বাতাস ও কনকনে ঠান্ডায় সড়কগুলো প্রায় ফাঁকা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ-যাদের দৈনিক আয় কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
শীতের প্রভাবে জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চিলমারী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ব্রহ্মপুত্র নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন মনতলা, শাখাহাতি ও কড়াই বরিশাল চরসহ একাধিক চরে বসবাসরত বৃদ্ধ ও শিশুরা এই শীতে চরম দুর্ভোগে রয়েছে। সরকারিভাবে পাওয়া মাত্র ১৮০টি কম্বল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারই অপ্রতুল বলে জানান তিনি।
ব্রেকিং নিউজ
সারাদেশে শীতের দাপট
-
দেশ প্রতিবেদক - প্রকাশ : ০২:৫৭:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
- ১১৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
সারাদেশে শীতের দাপট
জনপ্রিয়

















