ক্যামেরুনে অনুষ্ঠেয় ডব্লিউটিও-এর ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনকে সামনে রেখে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে চীন-নেতৃত্বাধীন আরসিইপি-এ অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও সহযোগিতা চাওয়া হবে সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকগুলোতে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ক্যামেরুনের রাজধানী Yaoundé-এ অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন আদায়ে জোর দেবে। এর আগে গত মাসে সরকার ইউএন সিডিপি-এর কাছে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায়। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির বার্ষিক বৈঠকে এ আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তা মূল্যায়নের জন্য একটি প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “ডব্লিউটিও মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে আমরা অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সমর্থন চাইব।”
এদিকে, ২৫ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশ আরসিইপি-তে সদস্যপদ পাওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনাও করেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ এই মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্মেলনে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারসূচির অন্যান্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ই-কমার্স, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং মৎস্য ভর্তুকি। মৎস্য খাতে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি আহরণে ভর্তুকি কমাতে বাংলাদেশ সম্মত হয়েছে বলেও জানান বাণিজ্য সচিব।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি সম্মেলনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও এটি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক এজেন্ডায় নেই। তবে কোনো দেশ আলোচনা তুললে বাংলাদেশ তাতে অংশ নিতে পারে।
এবারের সম্মেলনে ডব্লিউটিও সংস্কারই প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলডিসি উত্তরণ স্থগিতের পক্ষে সমর্থন পাওয়া কতটা কঠিন :
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ স্থগিতের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালালেও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কাজটি সহজ হবে না। মোস্তাফিজুর রহমনা এবং তানবীন আলম চৌধুরীর এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ডব্লিউটিও কাঠামোর মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণপ্রাপ্ত দেশগুলোর জন্য আলাদা কোনো স্বীকৃত গ্রুপ নেই।
ফলে বাংলাদেশকে এলডিসি গ্রুপের মধ্যেই কাজ করতে হবে। সাধারণত এলডিসিভুক্ত দেশগুলো উত্তরণপ্রাপ্ত দেশগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে, কারণ একসময় তাদেরও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। গবেষণাপত্রে আরও সুপারিশ করা হয়েছে, সম্মেলনে উত্তরণপ্রাপ্ত এলডিসি দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে আনতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, যিনি রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)- চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন—বাংলাদেশ কতটা সমর্থন পাবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
তিনি জানান, এলডিসি সমন্বয়ক দেশ গাম্বিয়া একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে মাথাপিছু প্রকৃত আয় ১,০০০ ডলারের নিচে থাকা এলডিসি ও উত্তরণপ্রাপ্ত দেশগুলোকে ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে (১৯৯০ সালের মার্কিন ডলার বিনিময় হার অনুযায়ী)। এই মানদণ্ডে বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার যোগ্যতা পেতে পারে।
এছাড়া, গাম্বিয়া ট্রিপস চুক্তির আওতায় বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংক্রান্ত সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। এতে করে এলডিসি উত্তরণের পরও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যে পেটেন্ট অব্যাহতির সুবিধা ধরে রাখতে পারবে বাংলাদেশ।
তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কনীতি এবং ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট বিভাজনের কারণে সম্মেলনে বড় ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন রজ্জাক।
তিনি বলেন, সব এলডিসি ও উত্তরণপ্রাপ্ত এলডিসি দেশ একসঙ্গে জোরালোভাবে তাদের দাবি তুলতে পারলে কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে, কারণ ডব্লিউটিওরও এলডিসি সংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে।
দেশ প্রতিবেদক 









