ঢাকা ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালি অবরোধে উপসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী

  • দেশ ডেস্ক
  • প্রকাশ : ০৯:৩৩:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
  • ১৯৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব এখন স্পষ্ট।

বাহরাইনের একটি সুপারমার্কেটে নিয়মিত কেনাকাটা করতে এসে মাহমুদ আলী জানান, দোকানের তাক এখনো পণ্য দিয়ে ভর্তি থাকলেও বিল পরিশোধের সময় বাড়তি খরচের চাপ অনুভূত হচ্ছে।

চার সন্তানের এই বাবা বলেন, “পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, তবে গত কয়েক দিনে কিছু খাদ্যপণ্যের দামে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি হয়েছে।” বিশেষ করে মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শুষ্ক আবহাওয়ার এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশের মতোই বাহরাইন আমদানিনির্ভর, বিশেষ করে খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-এর হামলার পর ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া সংঘাত পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক শ্নাইডার জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বেশিরভাগ বড় বন্দর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পণ্য খালাস কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে আকাশপথেও পরিবহন স্বাভাবিক সক্ষমতার নিচে চলছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত আবুধাবি বন্দর, জেবেল আলি বন্দর এবং দাম্মাম বন্দর প্রায় অচল হয়ে পড়ায় জাহাজগুলো এখন প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত ওমান ও আমিরাতের বিকল্প বন্দরে ভিড়ছে।

এ অবস্থায় সৌদি আরব নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। দেশটির আকাশসীমা এখনো খোলা রয়েছে এবং লোহিত সাগর উপকূলীয় বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ভারসাম্য আনা সম্ভব হচ্ছে।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উপসাগরীয় উপকূলের বন্দরগুলোর ওপর চাপ কমাতে সৌদি আরব নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বিকল্প লজিস্টিক রুট ও করিডর তৈরি করে পূর্বাঞ্চলের বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সাংবাদিকরা কাতার সীমান্তে ভারী ট্রাকের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করেছেন, যা স্থলপথে পণ্য পরিবহনের বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

এছাড়া সিরিয়া বা জর্ডান হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সড়কপথের বিকল্প করিডর থাকলেও এসব রুট ব্যয়বহুল, যানজটে পূর্ণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে জানান বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাদ্যপণ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এ ধরনের পণ্য প্রধানত এশিয়া থেকে আমদানি করা হয় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

বৈষম্য বাড়ছে দেশভেদে

বর্তমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতায় পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরব সরাসরি লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার রাখে, যা তাদের জন্য বড় সুবিধা। সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তাদের কাছে ৪ থেকে ৬ মাসের খাদ্য মজুদ রয়েছে। আর কাতার ২০১৭ সালে প্রতিবেশী দেশগুলোর আরোপিত অবরোধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কৌশলগত মজুদ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে বাহরাইন ও কুয়েত-এ সাধারণ ভোক্তারা ইতোমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করছেন।

যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতে সুপারমার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের হুমড়ি খাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সরকার কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থির করে এবং মাংস আমদানিতে ভর্তুকি দেয়।

কুয়েতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিকভাবে দাম এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মাংস ও মাছের দামে ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। উপসাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকা এবং ইরান, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি খাতের উদ্যোগ

পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি খাতও উদ্যোগ নিয়েছে। অঞ্চলে ২৮০টি সুপারমার্কেট পরিচালনাকারী লুলু রিটেইল চেইন জানিয়েছে, তাদের কাছে ৪ থেকে ৬ মাসের নিত্যপণ্যের মজুদ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ফল, সবজি, মাংস ও সামুদ্রিক খাদ্য আনার জন্য বিশেষ কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে ৩৭টি বিশেষ ফ্লাইটে ৬ হাজার টনের বেশি পণ্য আনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হবে না।

অর্থনীতিবিদ শ্নাইডারের মতে, “বর্তমানে কিছুটা প্রস্তুতি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দাম বাড়লেও তা সহনীয় পর্যায়ে আছে।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম, বিশেষ করে খাদ্যের ক্ষেত্রে, বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

জনপ্রিয়

হরমুজ প্রণালি অবরোধে উপসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী

প্রকাশ : ০৯:৩৩:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব এখন স্পষ্ট।

বাহরাইনের একটি সুপারমার্কেটে নিয়মিত কেনাকাটা করতে এসে মাহমুদ আলী জানান, দোকানের তাক এখনো পণ্য দিয়ে ভর্তি থাকলেও বিল পরিশোধের সময় বাড়তি খরচের চাপ অনুভূত হচ্ছে।

চার সন্তানের এই বাবা বলেন, “পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, তবে গত কয়েক দিনে কিছু খাদ্যপণ্যের দামে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি হয়েছে।” বিশেষ করে মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শুষ্ক আবহাওয়ার এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশের মতোই বাহরাইন আমদানিনির্ভর, বিশেষ করে খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-এর হামলার পর ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া সংঘাত পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক শ্নাইডার জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বেশিরভাগ বড় বন্দর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পণ্য খালাস কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে আকাশপথেও পরিবহন স্বাভাবিক সক্ষমতার নিচে চলছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত আবুধাবি বন্দর, জেবেল আলি বন্দর এবং দাম্মাম বন্দর প্রায় অচল হয়ে পড়ায় জাহাজগুলো এখন প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত ওমান ও আমিরাতের বিকল্প বন্দরে ভিড়ছে।

এ অবস্থায় সৌদি আরব নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। দেশটির আকাশসীমা এখনো খোলা রয়েছে এবং লোহিত সাগর উপকূলীয় বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ভারসাম্য আনা সম্ভব হচ্ছে।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উপসাগরীয় উপকূলের বন্দরগুলোর ওপর চাপ কমাতে সৌদি আরব নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বিকল্প লজিস্টিক রুট ও করিডর তৈরি করে পূর্বাঞ্চলের বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সাংবাদিকরা কাতার সীমান্তে ভারী ট্রাকের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করেছেন, যা স্থলপথে পণ্য পরিবহনের বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

এছাড়া সিরিয়া বা জর্ডান হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সড়কপথের বিকল্প করিডর থাকলেও এসব রুট ব্যয়বহুল, যানজটে পূর্ণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে জানান বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাদ্যপণ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এ ধরনের পণ্য প্রধানত এশিয়া থেকে আমদানি করা হয় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

বৈষম্য বাড়ছে দেশভেদে

বর্তমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতায় পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরব সরাসরি লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার রাখে, যা তাদের জন্য বড় সুবিধা। সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তাদের কাছে ৪ থেকে ৬ মাসের খাদ্য মজুদ রয়েছে। আর কাতার ২০১৭ সালে প্রতিবেশী দেশগুলোর আরোপিত অবরোধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কৌশলগত মজুদ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে বাহরাইন ও কুয়েত-এ সাধারণ ভোক্তারা ইতোমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করছেন।

যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতে সুপারমার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের হুমড়ি খাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সরকার কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থির করে এবং মাংস আমদানিতে ভর্তুকি দেয়।

কুয়েতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিকভাবে দাম এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মাংস ও মাছের দামে ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। উপসাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকা এবং ইরান, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি খাতের উদ্যোগ

পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি খাতও উদ্যোগ নিয়েছে। অঞ্চলে ২৮০টি সুপারমার্কেট পরিচালনাকারী লুলু রিটেইল চেইন জানিয়েছে, তাদের কাছে ৪ থেকে ৬ মাসের নিত্যপণ্যের মজুদ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি ফল, সবজি, মাংস ও সামুদ্রিক খাদ্য আনার জন্য বিশেষ কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে ৩৭টি বিশেষ ফ্লাইটে ৬ হাজার টনের বেশি পণ্য আনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হবে না।

অর্থনীতিবিদ শ্নাইডারের মতে, “বর্তমানে কিছুটা প্রস্তুতি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দাম বাড়লেও তা সহনীয় পর্যায়ে আছে।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম, বিশেষ করে খাদ্যের ক্ষেত্রে, বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”