জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিমান খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটের জন্য জেট ফুয়েলের মূল্য প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম রাত ১২টা থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এই ঘোষণার পর দেশের বিমান পরিবহন খাত থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম লিটার প্রতি ১১২.৪১ টাকায় থেকে বেড়ে হয়েছে ২০২.২৯ টাকা, যা শুল্ক ও ভ্যাটসহ। আন্তর্জাতিক রুটে এক লিটার জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে ০.৭৩৮৫ ডলার থেকে ১.৩২১৬ ডলারে।
এই সিদ্ধান্ত আসার ঠিক কয়েক দিন পরই ১৮ মার্চ আরও একটি জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা আসে, যা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এক ঘণ্টার মধ্যে স্থগিত করে দেয়। তবে এটি এই মাসে জেট ফুয়েলের দ্বিতীয় বৃদ্ধি। প্রথমবারের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা আসে ৮ মার্চ। তখন বলা হয় আন্তর্জাতিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে মূল্য ওঠানামা করছে। সেই সময় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জেট ফুয়েলের দাম লিটার প্রতি ৯৫.১২ টাকা থেকে ১১২.৪১ টাকায় ওঠে। আন্তর্জাতিক রুটে দাম বাড়ানো হয় ০.৬২ ডলার থেকে ০.৭৩৮৪ ডলারে।
নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, এই মূল্য বৃদ্ধি আগের তুলনায় অনেক বেশি। এতে বিমান খাতের মালিক ও অপারেটরদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (এওএবি) এই মূল্য বৃদ্ধিকে “অযৌক্তিক” এবং “চরমভাবে ক্ষতিকর” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
এওএবি-এর সাধারণ সম্পাদক মোফিজুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, “মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই জনগণকে আশ্বস্ত করেছে যে দেশে জ্বালানির কোন ঘাটতি নেই। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেল ট্যাঙ্কার আগের স্থির মূল্যে জ্বালানি নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে।”
তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কার ভিত্তিতে এত বড় পরিমাণে মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারেই অযৌক্তিক।”
এওএবি-এর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের এই জ্বালানি মূল্যের বৃদ্ধি প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ভারতের ও নেপালের জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও, মালদ্বীপে দাম ১৮.৫৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ২৪.৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থা সতর্ক করেছেন, এই “অস্বাভাবিক” মূল্য বৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। এর ফলে বিমান ভ্রমণ সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে যাবে এবং দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মূল্যের ধাক্কা বিমান খাতের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী সংখ্যা কমতে পারে, যা এয়ারলাইনের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিমান খাতের জন্য জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি টিকেটের দাম, পরিচালন খরচ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
অভ্যন্তরীণ বিমান শিল্পের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে এতো বড় বৃদ্ধি করা ন্যায্য নয়। “বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও এইভাবে দাম বৃদ্ধি করা শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি,” মোফিজুর রহমান বলেন।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা মনে করছে, এই হঠাৎ দাম বৃদ্ধির ফলে যাত্রী সংখ্যা কমে যাবে এবং স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। এ কারণে স্থানীয় বিমান খাতকে টেকসই করার জন্য নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের দাম যে হারে বেড়েছে, তা এক ধরনের “অসামঞ্জস্যপূর্ণ” সিদ্ধান্ত। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে স্থানীয় এয়ারলাইনগুলো আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে পারে।
এওএবি-এর পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। এছাড়া তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের মূল্য বৃদ্ধির ফলে দেশের বিমান খাতের প্রবৃদ্ধি স্থবির হতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
সর্বশেষ, দেশের বিমান খাতের স্বার্থে একটি সমন্বিত এবং বাস্তবসম্মত নীতি প্রয়োজন। সরকারের উচিত, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
দেশ প্রতিবেদক 









