ঢাকা ১২:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলে তালবাহানা, হঠাৎ এতো তেল কিনছে কারা

  • দেশ প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ১০:৫২:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৯১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

সরকার দাম না বাড়িয়ে দেড়শ’ কোটি টাকা প্রতিদিন ভর্তুকি দিয়ে দেশে স্বস্তি বজায় রাখতে চাইলেও জ্বালানি তেল সংকটে দুর্ভোগ আরো গভীর হচ্ছে। সারা দেশ থেকে পাওয়া গেছে ভোগান্তি আর অস্বস্তির খবর।

জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশের প্রায় সবকটি জেলার ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। আবার কোনও কোনও ফিলিং স্টেশনে দুই-তিন দিন পর পর রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হয়। ফলে ওই দিনগুলোতে স্টেশন বন্ধ রাখেন মালিকরা। যখন তেল পাওয়া যায় তখন চালু করা হয়।

এক- দেড় মাস আগে স্বাভাবিক থাকা পেট্রোল পাম্পগুলো বর্তমানে কখনো খোলা, কখনো বন্ধ। তাও এতটা অনিশ্চিত যে, কখন পাম্প খুলবে আর কখন বন্ধ হবে তা পাম্পমালিক বা কর্মীরাও নির্ধারণ করতে পারছেন না।

তারা বলছেন, কখন তেল আসবে তা এখন জানা থাকে না। ডিপো থেকে তেল যখন আসে তখন পাম্প খুলি, তেল শেষ হয়ে গেলে পাম্প বন্ধ করে দেই। ঝুলিয়ে দেই ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড।

এদিকে ‘তেল নেই’ লেখা পাম্পেও রাতভর দিনভর থাকে দীর্ঘ লাইন। এ বিষয়ে বন্ধ ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপেক্ষমান যাত্রীরা জানান,পোম্প খোলার এক দুই ঘন্টার মধ্যেই আবার বন্ধ হয়ে যায়। কোনো নির্ধারিত সময় নেই। হুট করে খুলে হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা্ই আগে থেকেই লাইন ধরে থাকি। খুললেই যেনো তেল পাই। কিন্তু লাইনে অপেক্ষমানরা জানেনই না কখন খুলবে পাম্প, শুধু জানেন- পাম্প খুলবে।

অন্যদিকে টিভি, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টালে চোখ রাখলেই দেখা যায় মন্ত্রী, উচ্চতর আমলাসহ সরকারপক্ষের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলতে যে তেল দেশের প্রয়োজন তা মজুদ করা আছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলেও বিকল্প উৎস থেকে বিকল্প পথে জ্বালানি আনার ব্যবস্থা হয়েছে।

একই সঙ্গে, রাতভর পেট্রোল পাম্পে লাইন ধরেও তেল মেলেনি, অবৈধভাবে মজুদ জ্বালানি তেল উদ্ধার এবং চোরাচালানি গ্রেপ্তার, তেল মজুদ করলে রক্ষা নেই- এমন বক্তব্য নানান পক্ষ থেকে নানাভাবে নিয়মিত আসছে। কিন্তু কোনো সমাধান নেই।

আবার প্রেটোল পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। ডিপো বলছে- আগে যেভাবে যে পরিমান তেল তারা নিতো সে পরিমান জ্বালানি তাদের দেওয়া হচ্ছে। এক মাস আগে পাম্পগুলো যে পরিমান তেল ডিপোকে সরবরাহ করার ক্রয়আদেশ দিতো, এখন তারা তিন চার গুন বেশি পরিমান চাহিদা দিচ্ছে।

অন্যদিকে এই কারসাজি রোধ করতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক করে নির্দেশনা দেন। কঠেঅর হয় মাঠপ্রশাসনও। ডিপোতে নজরদারি বাড়ানো হয়, মোতায়েন করা হয় বিজিবি। পাম্পগুলোও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়। রেশনিং পদ্ধতিসহ নানা পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।

তবে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে যে, পাম্পগুলো কেন আগের তুলনায় দ্বিগুন-তিনগুন তেল চাচ্ছে? হঠাৎ এতটা পাম্পগুলোতে এক দেড় মাসের ব্যবধানে দ্বিগুন-তিনগুন চাহিদা বৃদ্ধি পেলো কিভাবে? এই সময়ের মধ্যে যানবাহন বৃদ্ধির সংখ্যাও স্বাভাবিক- তাহলে এতো তেল কিনছে কারা?

ফিলিং স্টেশনের মালিকরা বলছেন, রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। সংকট থেকেই যাচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ পাওয়া গেলে তখনই সংকট কাটবে।

সারাদেশ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ৩৮৩ ফিলিং স্টেশনের অর্ধেকেই মেলে না তেল।

জানা গেছে, বিভাগের ৩৮৩টি পাম্পের মধ্যে বেশিরভাগই দিনের অর্ধেক সময় বন্ধ থাকছে। নগরের টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত এজেন্সিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মেশিনের ওপরে লিখে রাখা হয়েছে অকটেন নেই। কর্মচারীরা জানান, যমুনা অয়েল লিমিটেডের ডিপো থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার তেল আসার কথা রয়েছে। সেটি পৌঁছালে বিক্রি শুরু করা হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বিভাগে পাম্প আছে ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্টিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ২৫৫ জন। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম নগরে পাম্প আছে ৬২টি। অর্ধেকের বেশি দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কোনও পাম্প সকালে বন্ধ থাকলে আবার বিকালে তেল পাওয়ার পর চালু করা হয়।

পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বেশ কিছু পাম্পে গত একমাস ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মিলছে না। দিনের বেশিরভাগ সময় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকছে। কোনও কোনও পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

দেশে তেল আমদানির দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি। আর সরবরাহ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অনেক ফিলিং স্টেশন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ চাহিদা দিচ্ছে। এতে চাপ তৈরি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬২টির মতো পাম্প আছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি বেশি। তেল যা পাওয়া যায় তাতে চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।’

বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলায় ৩০টি, ঝালকাঠি জেলায় আটটি, পিরোজপুরে পাঁচটি, ভোলায় ছয়টি, পটুয়াখালীতে আটটি ও বরগুনায় তিনটি- মোট ৫৭টি পেট্রোল পাম্প। তেল সংকটের পর থেকে বেশিরভাগ সময় পাম্পগুলোতে তেল থাকে না। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যানবাহন ও নৌযান চালকদের। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে সাগরে বা নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না জেলেরা। তবে কিছু সংখ্যক জেলে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনে ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে যাচ্ছেন।

পোর্ট রোডের আড়তদার জহির শিকদার বলেন, ‌‘এক ব্যারেল (২০০ লিটার) ডিজেলের সরকারি মূল্য ২১ হাজার টাকা। তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকায়। তাও আবার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে একপ্রকার মাছ শিকার বন্ধই রয়েছে জেলেদের।’

রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলে নিবন্ধিত জ্বালানি তেলের ফিলিং স্টেশন ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০টিতে। বাকিগুলো থাকছে বন্ধ। জেলার ১০টি পাম্পে যখন তেলবিক্রি হচ্ছিল তখন বাকিলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছিল।

এদিকে তেলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারছেন না চাষিরা। ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোরো চাষিরা তেল নিতে শ্যালো মেশিন নিয়ে আসছেন।

এক মাস ধরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে রেলওয়ের ডিপোতে জ্বালানি তেল আসছে না। আগে ওয়াগনে আসা তেল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডিপো থেকেই নিতে পারতেন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। এখন এখানে তেল না থাকায় সড়কপথে আনতে হচ্ছে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে। এতে খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) খুলনার দৌলতপুর ডিপো থেকে আর তেল দিচ্ছে না। তাই তারাও তেল আনছেন না।

সরকারি তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েলের রাজশাহীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আগে পাম্পগুলোতে যে তেল সরবরাহ করা হতো, এখনও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দৌলতপুর ডিপো থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’

একই কথা বলেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিপিসি সরবরাহ দিচ্ছে না বলেই খুলনা থেকে রেলপথে তেল আসছে না। তবে বিপিসির সঙ্গে ভারতের আলাপ হচ্ছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর দিয়ে ভারত তেল দেবে। সেটি হলে পার্বতীপুর থেকে ওয়াগনে তেল আনা হবে। তখন বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের ডিলাররা সুবিধা পাবেন।’

রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, ‘তেল উত্তোলনকারী কোম্পানি বা ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের হাতে তেল নেই। তাই আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের কিছুই করার নেই।’

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহে ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১৫টি। এর মধ্যে সাতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে আছে। বাকি বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন খোলা থাকলেও তেল সংকটের কারণে দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। এ বিভাগের শেরপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে একটি বন্ধ আছে। বাকিগুলো খোলা থাকলেও তেল সংকটে দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে।

জামালপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন ২০টি। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে তিনটি বন্ধ। সদরের এমএস ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী সোলায়মান হোসেন বলেন, ডিপো থেকে তেল পেলে সচল রাখা হয়। না পেলে বন্ধ রাখা হয়।

রংপুর বিভাগের সব জেলায় বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পেট্রোল ও অকটেনের অভাবে বিভাগের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কিছু পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, শুধুমাত্র সিএনজি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ না করায় কৃষকরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলায় ফিলিং স্টেশন আছে ৩৫০টি। এর মধ্যে ২০টি বাদে বাকিগুলা সচল আছে। আট জেলার যানবাহন ও সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার। সেখানে বিভিন্ন ডিপো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন ডিজেলের সংকট থাকছে এক থেকে দুই লাখ লিটার।

পেট্রোলের চাহিদা প্রতিদিন পাঁচ লাখ ১০ হাজার লিটার। ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে দুই থেকে সোয়া দুই লাখ লিটার। একইভাবে অকটেনের চাহিদা দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার হলেও ডিপো থেকে দেওয়া হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার। ফলে কোনোভাবেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

এছাড়া সিলেটে জ্বালানি তেলের তেমন সংকট না থাকলেও লজিস্টিক সাপোর্টের সংকটে ভুগছে উপজেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলো।

সবমিলিয়ে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জ্বালানি তেলের ভোগান্তি বেড়েই চলছে। তেল সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বলছে, সব ঠিকঠাক আছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঠিক নেই, জ্বালানি তেলে শুধু আছে সাধারণ শ্রেণীর ভোক্তা-ক্রেতার দুর্ভোগ আর সরকারের ‘সব ঠিক আছে’ দাবিটি।

জনপ্রিয়

জ্বালানি তেলে তালবাহানা, হঠাৎ এতো তেল কিনছে কারা

প্রকাশ : ১০:৫২:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

সরকার দাম না বাড়িয়ে দেড়শ’ কোটি টাকা প্রতিদিন ভর্তুকি দিয়ে দেশে স্বস্তি বজায় রাখতে চাইলেও জ্বালানি তেল সংকটে দুর্ভোগ আরো গভীর হচ্ছে। সারা দেশ থেকে পাওয়া গেছে ভোগান্তি আর অস্বস্তির খবর।

জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশের প্রায় সবকটি জেলার ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। আবার কোনও কোনও ফিলিং স্টেশনে দুই-তিন দিন পর পর রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হয়। ফলে ওই দিনগুলোতে স্টেশন বন্ধ রাখেন মালিকরা। যখন তেল পাওয়া যায় তখন চালু করা হয়।

এক- দেড় মাস আগে স্বাভাবিক থাকা পেট্রোল পাম্পগুলো বর্তমানে কখনো খোলা, কখনো বন্ধ। তাও এতটা অনিশ্চিত যে, কখন পাম্প খুলবে আর কখন বন্ধ হবে তা পাম্পমালিক বা কর্মীরাও নির্ধারণ করতে পারছেন না।

তারা বলছেন, কখন তেল আসবে তা এখন জানা থাকে না। ডিপো থেকে তেল যখন আসে তখন পাম্প খুলি, তেল শেষ হয়ে গেলে পাম্প বন্ধ করে দেই। ঝুলিয়ে দেই ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড।

এদিকে ‘তেল নেই’ লেখা পাম্পেও রাতভর দিনভর থাকে দীর্ঘ লাইন। এ বিষয়ে বন্ধ ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপেক্ষমান যাত্রীরা জানান,পোম্প খোলার এক দুই ঘন্টার মধ্যেই আবার বন্ধ হয়ে যায়। কোনো নির্ধারিত সময় নেই। হুট করে খুলে হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা্ই আগে থেকেই লাইন ধরে থাকি। খুললেই যেনো তেল পাই। কিন্তু লাইনে অপেক্ষমানরা জানেনই না কখন খুলবে পাম্প, শুধু জানেন- পাম্প খুলবে।

অন্যদিকে টিভি, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টালে চোখ রাখলেই দেখা যায় মন্ত্রী, উচ্চতর আমলাসহ সরকারপক্ষের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলতে যে তেল দেশের প্রয়োজন তা মজুদ করা আছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলেও বিকল্প উৎস থেকে বিকল্প পথে জ্বালানি আনার ব্যবস্থা হয়েছে।

একই সঙ্গে, রাতভর পেট্রোল পাম্পে লাইন ধরেও তেল মেলেনি, অবৈধভাবে মজুদ জ্বালানি তেল উদ্ধার এবং চোরাচালানি গ্রেপ্তার, তেল মজুদ করলে রক্ষা নেই- এমন বক্তব্য নানান পক্ষ থেকে নানাভাবে নিয়মিত আসছে। কিন্তু কোনো সমাধান নেই।

আবার প্রেটোল পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। ডিপো বলছে- আগে যেভাবে যে পরিমান তেল তারা নিতো সে পরিমান জ্বালানি তাদের দেওয়া হচ্ছে। এক মাস আগে পাম্পগুলো যে পরিমান তেল ডিপোকে সরবরাহ করার ক্রয়আদেশ দিতো, এখন তারা তিন চার গুন বেশি পরিমান চাহিদা দিচ্ছে।

অন্যদিকে এই কারসাজি রোধ করতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক করে নির্দেশনা দেন। কঠেঅর হয় মাঠপ্রশাসনও। ডিপোতে নজরদারি বাড়ানো হয়, মোতায়েন করা হয় বিজিবি। পাম্পগুলোও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়। রেশনিং পদ্ধতিসহ নানা পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।

তবে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে যে, পাম্পগুলো কেন আগের তুলনায় দ্বিগুন-তিনগুন তেল চাচ্ছে? হঠাৎ এতটা পাম্পগুলোতে এক দেড় মাসের ব্যবধানে দ্বিগুন-তিনগুন চাহিদা বৃদ্ধি পেলো কিভাবে? এই সময়ের মধ্যে যানবাহন বৃদ্ধির সংখ্যাও স্বাভাবিক- তাহলে এতো তেল কিনছে কারা?

ফিলিং স্টেশনের মালিকরা বলছেন, রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। সংকট থেকেই যাচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ পাওয়া গেলে তখনই সংকট কাটবে।

সারাদেশ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ৩৮৩ ফিলিং স্টেশনের অর্ধেকেই মেলে না তেল।

জানা গেছে, বিভাগের ৩৮৩টি পাম্পের মধ্যে বেশিরভাগই দিনের অর্ধেক সময় বন্ধ থাকছে। নগরের টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত এজেন্সিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মেশিনের ওপরে লিখে রাখা হয়েছে অকটেন নেই। কর্মচারীরা জানান, যমুনা অয়েল লিমিটেডের ডিপো থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার তেল আসার কথা রয়েছে। সেটি পৌঁছালে বিক্রি শুরু করা হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বিভাগে পাম্প আছে ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্টিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ২৫৫ জন। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম নগরে পাম্প আছে ৬২টি। অর্ধেকের বেশি দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কোনও পাম্প সকালে বন্ধ থাকলে আবার বিকালে তেল পাওয়ার পর চালু করা হয়।

পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বেশ কিছু পাম্পে গত একমাস ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মিলছে না। দিনের বেশিরভাগ সময় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকছে। কোনও কোনও পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

দেশে তেল আমদানির দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি। আর সরবরাহ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অনেক ফিলিং স্টেশন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ চাহিদা দিচ্ছে। এতে চাপ তৈরি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬২টির মতো পাম্প আছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি বেশি। তেল যা পাওয়া যায় তাতে চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।’

বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলায় ৩০টি, ঝালকাঠি জেলায় আটটি, পিরোজপুরে পাঁচটি, ভোলায় ছয়টি, পটুয়াখালীতে আটটি ও বরগুনায় তিনটি- মোট ৫৭টি পেট্রোল পাম্প। তেল সংকটের পর থেকে বেশিরভাগ সময় পাম্পগুলোতে তেল থাকে না। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যানবাহন ও নৌযান চালকদের। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে সাগরে বা নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না জেলেরা। তবে কিছু সংখ্যক জেলে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনে ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে যাচ্ছেন।

পোর্ট রোডের আড়তদার জহির শিকদার বলেন, ‌‘এক ব্যারেল (২০০ লিটার) ডিজেলের সরকারি মূল্য ২১ হাজার টাকা। তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকায়। তাও আবার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে একপ্রকার মাছ শিকার বন্ধই রয়েছে জেলেদের।’

রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলে নিবন্ধিত জ্বালানি তেলের ফিলিং স্টেশন ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০টিতে। বাকিগুলো থাকছে বন্ধ। জেলার ১০টি পাম্পে যখন তেলবিক্রি হচ্ছিল তখন বাকিলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছিল।

এদিকে তেলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারছেন না চাষিরা। ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোরো চাষিরা তেল নিতে শ্যালো মেশিন নিয়ে আসছেন।

এক মাস ধরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে রেলওয়ের ডিপোতে জ্বালানি তেল আসছে না। আগে ওয়াগনে আসা তেল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডিপো থেকেই নিতে পারতেন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। এখন এখানে তেল না থাকায় সড়কপথে আনতে হচ্ছে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে। এতে খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) খুলনার দৌলতপুর ডিপো থেকে আর তেল দিচ্ছে না। তাই তারাও তেল আনছেন না।

সরকারি তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েলের রাজশাহীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আগে পাম্পগুলোতে যে তেল সরবরাহ করা হতো, এখনও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দৌলতপুর ডিপো থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’

একই কথা বলেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিপিসি সরবরাহ দিচ্ছে না বলেই খুলনা থেকে রেলপথে তেল আসছে না। তবে বিপিসির সঙ্গে ভারতের আলাপ হচ্ছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর দিয়ে ভারত তেল দেবে। সেটি হলে পার্বতীপুর থেকে ওয়াগনে তেল আনা হবে। তখন বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের ডিলাররা সুবিধা পাবেন।’

রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, ‘তেল উত্তোলনকারী কোম্পানি বা ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের হাতে তেল নেই। তাই আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের কিছুই করার নেই।’

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহে ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১৫টি। এর মধ্যে সাতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে আছে। বাকি বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন খোলা থাকলেও তেল সংকটের কারণে দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। এ বিভাগের শেরপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে একটি বন্ধ আছে। বাকিগুলো খোলা থাকলেও তেল সংকটে দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে।

জামালপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন ২০টি। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে তিনটি বন্ধ। সদরের এমএস ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী সোলায়মান হোসেন বলেন, ডিপো থেকে তেল পেলে সচল রাখা হয়। না পেলে বন্ধ রাখা হয়।

রংপুর বিভাগের সব জেলায় বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পেট্রোল ও অকটেনের অভাবে বিভাগের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কিছু পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, শুধুমাত্র সিএনজি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ না করায় কৃষকরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলায় ফিলিং স্টেশন আছে ৩৫০টি। এর মধ্যে ২০টি বাদে বাকিগুলা সচল আছে। আট জেলার যানবাহন ও সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার। সেখানে বিভিন্ন ডিপো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন ডিজেলের সংকট থাকছে এক থেকে দুই লাখ লিটার।

পেট্রোলের চাহিদা প্রতিদিন পাঁচ লাখ ১০ হাজার লিটার। ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে দুই থেকে সোয়া দুই লাখ লিটার। একইভাবে অকটেনের চাহিদা দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার হলেও ডিপো থেকে দেওয়া হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার। ফলে কোনোভাবেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

এছাড়া সিলেটে জ্বালানি তেলের তেমন সংকট না থাকলেও লজিস্টিক সাপোর্টের সংকটে ভুগছে উপজেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলো।

সবমিলিয়ে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জ্বালানি তেলের ভোগান্তি বেড়েই চলছে। তেল সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বলছে, সব ঠিকঠাক আছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঠিক নেই, জ্বালানি তেলে শুধু আছে সাধারণ শ্রেণীর ভোক্তা-ক্রেতার দুর্ভোগ আর সরকারের ‘সব ঠিক আছে’ দাবিটি।