রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বহুল আলোচিত এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আগামী রোববার (৭ জুন) রায়ের দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন।
আদালত সূত্র জানায়, শুনানির শুরুতে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলাটিকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। অপর আসামি স্বপ্না আক্তার অপরাধ সংঘটনের পর বিভিন্নভাবে তাকে সহায়তা করেন। মামলার সাক্ষ্য, ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত এবং তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। পাশাপাশি ঘটনার সময় সোহেল রানা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন বলেও আদালতে উল্লেখ করেন তিনি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধান আসামির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে আইনের আলোকে শাস্তির আবেদন জানান।
পরে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিপক্ষের বক্তব্যের জবাব দিয়ে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, মামলার উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
এর আগে বুধবার মামলার আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ওই দিন আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও একপর্যায়ে আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি অপরাধ করেছি। আমাকে মাফ করে দিন।’ একই সঙ্গে তিনি ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন।
তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সোহেল রানার ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি কিংবা তদন্ত নথিতে ‘ডলার’ নামে কোনো ব্যক্তির উল্লেখ নেই। বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে এ ধরনের বক্তব্য বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।
অন্য আসামি স্বপ্না আক্তার আদালতে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্তের একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আটক করা হয়।
তদন্ত শেষে ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার বিচার চলাকালে নিহত শিশুর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীসহ মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। শিশু সাক্ষী হওয়ায় রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য বিশেষ ব্যবস্থায় ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়। এছাড়া তদন্তে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আলোচিত এ মামলার রায়কে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এখন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে নিহত রামিসার পরিবারসহ পুরো দেশ।
দেশ প্রতিবেদক 









