ঢাকা ০৬:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি: বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি ও ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা

  • দেশ প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ০৭:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • ১৬৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

ব্যয়ে আরও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি কার্যকর করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় সরকারি অর্থে বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি কেনা, ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণসহ একাধিক খাতে ব্যয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে জারি করা জরুরি পরিপত্রে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় সংকোচন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই পরিপত্র তারই বাস্তবায়ন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন গাড়ি কেনায় কার্যত নিষেধাজ্ঞা:

পরিপত্র অনুযায়ী, পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সীমিত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১০ বছরের বেশি পুরোনো সরকারি গাড়ি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ফুল ইলেকট্রিক ভেহিকল কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সরকার।

নতুন ভবন নির্মাণেও স্থগিতাদেশ: সরকারি অর্থে নতুন আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণের ব্যয় স্থগিত করা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো অর্থ বিভাগের বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় পেতে পারে।

সরকারের মতে, নতুন প্রকল্প শুরু করার পরিবর্তে চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করাই উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়াবে।

ভূমি অধিগ্রহণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: পরিচালন বাজেটে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়ের আগে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে।

সরকারি অর্থে বিদেশ সফরে কড়াকড়ি: নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ কার্যত স্থগিত করা হয়েছে।

তবে বিদেশি সরকার বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা কার্যক্রম, মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল থাকবে।

কর্মকর্তাদের গাড়ি ঋণও স্থগিত: সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া বিশেষ ঋণ সুবিধার বরাদ্দও স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য চালানের পূর্বপরিদর্শন ও কারখানা গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার মতো প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের জন্য বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতিতে জোর: পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ কম ব্যয়ে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে হবে এবং অগ্রাধিকারহীন ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং বাজেট ঘাটতির বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নেও ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

 

জনপ্রিয়

সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি: বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি ও ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশ : ০৭:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

ব্যয়ে আরও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি কার্যকর করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় সরকারি অর্থে বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি কেনা, ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণসহ একাধিক খাতে ব্যয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে জারি করা জরুরি পরিপত্রে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় সংকোচন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই পরিপত্র তারই বাস্তবায়ন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন গাড়ি কেনায় কার্যত নিষেধাজ্ঞা:

পরিপত্র অনুযায়ী, পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সীমিত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১০ বছরের বেশি পুরোনো সরকারি গাড়ি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ফুল ইলেকট্রিক ভেহিকল কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সরকার।

নতুন ভবন নির্মাণেও স্থগিতাদেশ: সরকারি অর্থে নতুন আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণের ব্যয় স্থগিত করা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো অর্থ বিভাগের বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় পেতে পারে।

সরকারের মতে, নতুন প্রকল্প শুরু করার পরিবর্তে চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করাই উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়াবে।

ভূমি অধিগ্রহণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: পরিচালন বাজেটে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়ের আগে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে।

সরকারি অর্থে বিদেশ সফরে কড়াকড়ি: নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ কার্যত স্থগিত করা হয়েছে।

তবে বিদেশি সরকার বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা কার্যক্রম, মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল থাকবে।

কর্মকর্তাদের গাড়ি ঋণও স্থগিত: সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া বিশেষ ঋণ সুবিধার বরাদ্দও স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য চালানের পূর্বপরিদর্শন ও কারখানা গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার মতো প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের জন্য বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতিতে জোর: পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ কম ব্যয়ে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে হবে এবং অগ্রাধিকারহীন ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং বাজেট ঘাটতির বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নেও ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।