গৃহকর্মী হিসেবে কাজের কথা বলে নেওয়া বাংলাদেশি নারীদের একটি অংশ সৌদি আরবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্রের মাধ্যমে অনেক নারীকে কথিত ‘টিস্যু কোম্পানিতে’ কাজ দেওয়ার নামে যৌন ও মানবিক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্যও উদ্বেগজনক সংকেত বলে মত দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীদের একজন শিউলি (ছদ্মনাম)। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০২৫ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। সেই সুযোগে দালাল চক্র তাকে একটি টিস্যু কোম্পানিতে কাজের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে প্রতারণার মাধ্যমে যৌন কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।
শিউলি জানান, তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হতো। নিয়মিত মারধর, অমানবিক আচরণ এবং খাদ্য বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন নির্যাতনের মধ্যে থাকার পর তিনি একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং পরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কয়েক মাস কারাভোগের পর দেশে ফিরে সন্তান জন্ম দেন তিনি।
স্বামীকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই বিদেশে গিয়েছিলেন শিউলি। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বদলে তাকে ফিরতে হয়েছে গভীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে।
অভিবাসন খাতে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৫ সালে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দুই হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে প্রায় ৭৪ হাজার পুরুষ কর্মীও দেশে ফেরত এসেছেন, যাদের বড় অংশ অবৈধ পথে বিদেশে গিয়েছিলেন।
সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আরও প্রায় ২৪ হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে ২৩ হাজারের বেশি পুরুষ কর্মী।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতন, শোষণ বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিদেশ থেকে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং দক্ষতা যাচাই অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বিদেশে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, সৌদি আরব, ওমানসহ কয়েকটি দেশে আইনি সহায়তা জোরদার করতে লিগ্যাল ফার্মের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনি সহায়তা নয়, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মীদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে একদিকে যেমন মানবিক বিপর্যয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত এবং রেমিট্যান্স অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে।
দেশ প্রতিবেদক 
















