ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে ভোলায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল সোয়া ৪টায় ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে শেষ শ্রদ্ধায় বিদায় জানান মানুষ। এই নক্ষত্রের বিদায়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক যুগের অবসান ঘটল।
এদিন দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা। সেখানে হাজারো মানুষের ঢল নামে।
তোফালের আহমেদের বর্ণাঢ্য জীবন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনেও তিনি ছিলেন অগ্রভাগে।
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭০ সালের ৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। একই বছর ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি ভোলার দৌলতখাঁ–তজুমদ্দিন–মনপুরা আসন থেকে ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের একজন শীর্ষ সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৭৩ সালে ভোলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার গঠনের পর তিনি রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী হন।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ৬ সেপ্টেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০১ সালের নির্বাচনে ভোলার তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও পরাজিত হন। পরে ২০০৮ সালে ভোলা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে ভোলা-১ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালেও অসুস্থ অবস্থায় নির্বাচিত হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তিনি ৯টিতে বিজয়ী হন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রজীবনেই। ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সক্রিয় ছিলেন ছাত্ররাজনীতিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ডাকসুর ভিপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তোফায়েল আহমেদ। এর মধ্যদিয়ে ক্ষণজন্মা, এই কীর্তিমানের যুগের অবসান হলো।
দেশ প্রতিবেদক, ভোলা 









